আব্রাহাম লিংকন: আমেরিকার সমাজ বদলে দেওয়া কালজয়ী প্রেসিডেন্ট।

আমেরিকার ইতিহাসে আব্রাহাম লিংকন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তিত্ব। উনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন গৃহযুদ্ধ থামানো এবং দাসপ্রথা বিলুপ্তির জন্য ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এই ব্লগটিতে এই মহান নেতার জীবন, তার সংগ্রাম এবং বিজয় এবং আমেরিকান সমাজে তার অবদানগুলো তুলে ধরব।

আব্রাহাম লিংকন: আমেরিকার সমাজ বদলে দেওয়া কালজয়ী প্রেসিডেন্ট।


আব্রাহাম লিংকন এর পূর্ব জীবন

আব্রাহাম লিংকন ১৮০৯ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি কেনটাকির হজেনভিলে জন্মগ্রহণ করেন। তার বয়স যখন মাত্র নয় বছর তখন তার মা ন্যান্সি হ্যাঙ্কস লিংকন মারা যান। সে এবং তার বোন সারা বাবা টমাস লিঙ্কনের কাছে বড় হয়।

ছোট বেলা থেকেই তিনি বই পড়তে অনেক পছন্দ করতেন প্রায় সময়ই বন্ধু এবং প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ধার করে বই পড়তে। অল্প বয়স থেকেই তার রাজনীতি সম্পর্কে আগ্রহ জন্মায় এবং তিনি প্রায়শই তার বন্ধু এবং পরিবারের সাথে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে তর্ক বিতর্ক করতেন।

১৮১৬ সালে লিঙ্কনের পরিবার ইন্ডিয়ানার সীমান্তবর্তী এলাকায় চলে যায় এবং সেখানে একটি বাড়িতে বসতি স্থাপন করে। লিংকনের বাবা খুব বেশি সচ্ছল ছিলেন না, যার জন্য সীমান্তে লিঙ্কনের শৈশব অনেক কঠিন ছিল। লিংকন তখন থেকেই একটি খামারে কাজ করতেন এবং পাশাপাশি তার পড়াশোনা চালিয়ে যান। তিনি ছোট বেলা থেকেই অনেক মেধাবী ছিলেন।

My bangla blog এর সকল পোস্ট গুগল নিউজে পেতে ভিজিট করুন এখানে Google news

রাজনৈতিক জীবন

১৮৩০ সালে লিঙ্কনের পরিবার ইলিনয়ে চলে যায়। ২১ বছর বয়সে লিঙ্কন বাড়ি ছেড়ে চলে যান এবং আইন বিষয়ক পড়াশোনায় মনযোগ দেন। ১৮৩৪ সালে ইলিনয় রাজ্যের আইনসভায় নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। পরের কয়েক বছর ধরে আব্রাহাম লিংকন রাষ্ট্রীয় আইনসভায় কাজ চালিয়ে যান। ১৮৪৬ সালে তিনি মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হন। তখন থেকেই তিনি দাস প্রথা বিরোধী ছিলেন, যার জন্য দেশব্যাপী তুমুল জনপ্রিয়তা পান।

আরও পড়ুন:  প্রিন্সেস ডায়ানা: একজন রাজকুমারীর গল্প।

১৮৬০ সালে আব্রাহাম লিংকন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পদের জন্য রিপাবলিকান পার্টি থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। সে সময় প্রায় ৪০% ভোট পেয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করেন। তিনি ১৮৬১ সালের ৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি হিসাবে অভিষিক্ত হন।

তিনি এমন এক সময়ে রাষ্ট্রপতি হন যখন দেশটি গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ছিল এবং তার যোগদানের এক মাস পর থেকেই দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত চলা এই সংঘাতটি ছিল আমেরিকান ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক যুদ্ধ, যেখানে আনুমানিক ৬২০,০০০ জন সৈন্য এবং বেসামরিক লোক প্রাণ হারিয়েছিল।

এরকম একটি সংঘাত হওয়া সত্ত্বেও আব্রাহাম লিংকন নিজেকে একজন দক্ষ সামরিক কৌশলবিদ এবং শক্তিশালী নেতা হিসেবে প্রমাণ করেন। তিনি ১৮৬৩ সালে কনফেডারেট-অধিকৃত অঞ্চলের সমস্ত দাসদের মুক্ত করার ঘোষণা ও আইন প্রনয়ণ করেন। এই আইনটি যুদ্ধের একটি টার্নিং পয়েন্ট ছিল এবং জনসাধারণের সমর্থন পেতে সাহায্য করেছিল।

১৮৬৪ সালের নির্বাচনে লিঙ্কন তার প্রতিপক্ষ জর্জ বি. ম্যাকক্লেলানকে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করে দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হন। তার দ্বিতীয় মেয়াদে, তিনি দেশ পুনর্গঠনে এবং গৃহযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার জন্য কাজ করে গিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন:  কনফুসিয়াস: একজন চীনা দার্শনিকের জীবনদর্শন।

তাঁর ঐতিহাসিক গেটিসবার্গের ভাষণের মাধ্যমে তিনি সম অধিকার, প্রজাতন্ত্রবাদ,স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের প্রবক্তা হয়ে উঠেন। তিনি তার মুক্তিকামী ঘোষণা এবং সেনাবাহিনী কর্তৃক দাসদের রক্ষা এবং বিভিন্ন কাজে নিয়োগের আদেশ দিয়ে দাসত্বের অবসান ঘটিয়েছিলেন। তিনি সীমান্ত রাজ্যগুলিকে দাসত্ব নিষিদ্ধ করার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশ থেকে দাসত্ব নিষিদ্ধ করেছিলেন।

১৮৬৫ সালের ১৪ই এপ্রিল কনফেডারেট সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণের মাত্র কয়েক দিন পরে লিঙ্কন তাঁর স্ত্রী মেরির সাথে ফোর্ডের থিয়েটারে একটি নাটকে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে কনফেডারেট সেনাবাহিনীর পরিকল্পনায় জন উইলকস বুথ তাকে হত্যা করেছিলেন। তার মৃত্যু ছিল জাতির জন্য বিশাল একটি ধাক্কা। তাকে এখন পর্যন্ত আমেরিকান ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রপতি হিসাবে স্মরণ করা হয়।

লিঙ্কনকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত অগণিত বই, চলচ্চিত্র এবং তথ্যচিত্র রচিত হয়েছে। তাকে স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের রোল মডেল মনে করা করা হয়। গৃহযুদ্ধের সময় তার নেতৃত্ব আমেরিকান ইতিহাসের গতিপথকে বদলে দিয়েছিল। তার কথা এবং কাজ সারা বিশ্বের মানুষকে এখনো অনুপ্রাণিত করে।

আব্রাহাম লিংকন এমন একজন অসাধারণ নেতা ছিলেন যিনি অনেক বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি আমেরিকানদের অনুপ্রাণিত করেছিল যেটা মার্কিনরা এখনো মনে লালন করে। তার কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং ন্যায়বিচার সকলের জন্য অনুকরণীয়। তার জীবন সংক্ষিপ্ত ছিল, কিন্তু তিনি বিশ্বের উপর একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে গিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন:  শায়েস্তা খান: টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত যার সময়ে।

আব্রাহাম লিংকন এর কিছু বিখ্যাত উক্তি

“প্রায় সব পুরুষই প্রতিকূলতা সহ্য করতে পারে, কিন্তু আপনি যদি একজন মানুষের চরিত্র পরীক্ষা করতে চান তবে তাকে ক্ষমতা দিন।”
“আমার সেরা বন্ধু হল এমন একজন ব্যক্তি যে আমাকে এমন একটি বই দেবে যা আমি পড়িনি।”
“যারা অন্যদের স্বাধীনতা অস্বীকার করে তারা নিজে এর যোগ্য নয়।”
“ভবিষ্যত আন্দাজ করার সর্বোত্তম উপায় হল এটি তৈরি করে নেওয়া।”
“ভবিষ্যত সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জিনিস হল এটি কোনো এক সময়ে এমনি চলে আসে।”
“আমি এমন একজন লোককে নিয়ে খুব বেশি ভাবি না যিনি আজকের চেয়ে গতকাল বেশি জ্ঞানের পরিচয় দিয়েছিল।”
“জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভালো।”
“আমি জয়ী হতে বাধ্য নই, কিন্তু আমি সত্যবাদি হতে বাধ্য। আমি সফল হব এর কোনো নিশ্চয়তা নেই, কিন্তু আমার কাছে যা আছে তা আমার বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ঠ।”
“সুযোগ তাদের কাছেই আসে যারা অপেক্ষা করে।”

Leave a Comment