ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলপথ: পৃথিবীর দীর্ঘতম রেলপথের ইতিহাস।


ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলপথ হল মানবসৃষ্ট পৃথিবীর দীর্ঘতম রেলপথ যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৭৭২ মাইল (৯২৮৯ কিমি)। এটি মূলত একটি রাশিয়ান রেল নেটওয়ার্ক। মস্কো থেকে নিঝনি নভগোরড, ইয়েকাটেরিনবার্গ, ওমস্ক, নভোসিবিরস্ক এবং ইরকুটস্ক হয়ে ভ্লাদিভোস্টক পর্যন্ত দীর্ঘ রাস্তা পাড়ি দিতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগে। রেলপথটি চীন, মঙ্গোলিয়া ও উত্তর কোরিয়ায় সাথে সংযুক্ত রয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর এক অনন্য সৃষ্টি এই ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলপথ।

ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলপথ: পৃথিবীর দীর্ঘতম রেলপথের ইতিহাস।

ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলপথ এর ইতিহাস

১৮৫৭ সালে পূর্ব সাইবেরিয়া অঞ্চলের গভর্নর মুরাভইওভ-আমুরস্কি সর্বপ্রথম রাশিয়ার সাইবেরিয়ান অঞ্চলে রেলপথ স্থাপনের চিন্তা করেন। তখন প্রকৌশলী হিসেবে ডি. রোমানভকে নিয়োগ দেওয়া হয় যিনি আমুর নদী থেকে ডি-কাস্ত্রি উপসাগর পর্যন্ত প্রসারিত একটি রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন। পরবর্তীতে যথাযথ সরকারি তহবিলের অভাবে প্রকল্পটি ব্যর্থ হয়। যদিও বিদেশী উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে ঋন ও বিনিয়োগের সুযোগ ছিল, তথাপি রাশিয়ান সরকার এতে নিষেধাজ্ঞা দেয় কারণ তাদের ভয় ছিল এতে করে এই অঞ্চলে বিদেশী প্রভাব এবং পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠা হবে।
১৮৯১ সালে জার তৃতীয় আলেকজান্ডার ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলপথের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। আর এই পরিকল্পনার সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন ডাচ বংশোদ্ভূত জর্জিয়ান কাউন্ট সের্গেই উইট্টে।
প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয় “গ্রেট সাইবেরিয়ান ওয়ে”। এই বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নে রাশিয়ান সরকার প্রথম থেকেই আর্থিকভাবে হিমশিম খেতে থাকে। প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ ছিল আনুমানিক ৩৫০ মিলিয়ন রুবল যা পর্যাপ্ত ছিল না। যার কারণে ব্যালাস্টের স্তর, প্রতি মাইল স্লিপারের সংখ্যা কমাতে হয়েছে। লোহা ও ইস্পাত দিয়ে যে ব্রিজগুলো নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল সেগুলো কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়। এত প্রতিবন্ধকতার মাঝে ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য রেলপথ নির্মাণ অনেক কঠিন কাজ ছিল। নির্মাণ কাজের জন্য সরকার অনেক শ্রমিক আমদানি করতে বাধ্য হয়। এর পাশাপাশি বৈরী আবহাওয়ার কারণে বেশ কিছু জায়গার কাজ বন্ধ করে দিতে হয়। বড় নদীগুলিতে সেতু নির্মাণ করাও চ্যালেঞ্জিং ছিল। ধারণা করা হয়, রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে ৯০,০০০ এরও বেশি শ্রমিক কাজ করেছিল।
প্রাথমিকভাবে চীনের সাথে চায়না ট্রান্সবাইকাল অঞ্চল থেকে ভ্লাদিভোস্টক পর্যন্ত সরাসরি মাঞ্চুরিয়া (চায়না ইস্টার্ন রেলওয়ে) জুড়ে লাইন নির্মাণের জন্য রাশিয়ানদের চুক্তি হয়। এই ট্রান্স-মাঞ্চুরিয়ান লাইনের কাজ ১৯০১ সালে সম্পন্ন হয়। কিন্তু ১৯০৪-০৫ সালের রুশ-জাপানিজ যুদ্ধের পরে রাশিয়া আশঙ্কা করেছিল জাপান মাঞ্চুরিয়া দখল করবে। এজন্য পূর্বদিকে অন্য আরেকটি দীর্ঘ রেলপথ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যার নাম দেওয়া হয় আমুর রেলওয়ে। যেটি ভ্লাদিভোস্টক থেকে ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলপথের সাথে সংযুক্ত ছিল। আমুর রেলওয়ের কাজ ১৯১৬ সালে শেষ হয়।
১৯০৪-০৫ সালের রুশ-জাপানিজ যুদ্ধের সময় আর্থিক টানাপোড়েন কারণে আমুর রেলপথের খরচ অনেক কমিয়ে আনা হয়। একারণে পরবর্তীতে রেলপথটি অনেক জায়গায় নড়েচড়ে হওয়া থেকে শুরু করে ভেঙে পড়তে থাকে। ১৯২০ এর প্রথম দশকে রেলপথটি আবার মেরামত করা হয়। রেল লাইনের বিদ্যুতায়ন ১৯২৯ সালে শুরু হলেও ২০০২ সালে এর কাজ সম্পুর্নভাবে শেষ হয়।
মস্কোর ইয়ারোস্লাভ স্টেশন ১৯০২ সালে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং ১৯০৩ সালের গ্রীষ্মে প্রথম যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু করে। শুরুর দিকে বৈকাল হ্রদ পাড়ি দিতে ফেরির প্রয়োজন হত। পরবর্তীতে এই পথে তেত্রিশটি টানেল সহ শতাধিক সেতু নির্মিত হয়।
ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলপথ পশ্চিম সাইবেরিয়ার বসতি স্থাপন এবং কাঠামোগত উন্নয়নে বিপ্লব নিয়ে এসেছিল।

আরও পড়ুন:  কাস্পিয়ান সাগর: পৃথিবীর বৃহত্তম হ্রদ। Caspian sea - My bangla blog

ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলপথ: পৃথিবীর দীর্ঘতম রেলপথের ইতিহাস।

বর্তমান অবস্থা

বর্তমানে ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলপথ রাশিয়ার অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বছরে আনুমানিক ২৫৯,০০০ এরও বেশি কন্টেইনার এই রাস্তা দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় যায়, যা রাশিয়ার মোট রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশ। ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলপথকে ইউরোপ ও এশিয়ায় স্থলপথে ভ্রমণের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ততম পথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাশিয়ান রেলওয়ে চীন ও জাপান থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহন করে যা থেকেও রাশিয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে।
পাশাপাশি বিদেশী অনেক পর্যটকের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু এটা। প্রতি বছর প্রচুর পর্যটক ট্রেনে চড়ে রেলপথের আশেপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসে।

ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলপথের রুট

ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলপথ তিনটি প্রধান রুটে বিভক্ত এবং সম্প্রতি আরেকটি নতুন রুট যাত্রীদের সুবিধার জন্য চালু করা হয়েছে।

ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলওয়ে রুট: মস্কোর ইয়ারোস্লাভস্কি ভকজাল – ইয়ারোস্লাভ – চেলিয়াবিনস্ক – ওমস্ক – নোভোসিবিরস্ক – ইরকুটস্ক – ক্রাসনোয়ারস্ক – উলান-উদে – চিতা – খবরভস্ক – দক্ষিণ সাইবেরিয়া – ভ্লাদিভোস্টক

ট্রান্স মাঞ্চুরিয়ান রেলওয়ে রুট: তারস্কায়া – হারবিন – মুদানজিয়াং – উসুরিয়স্ক – ভ্লাদিভোস্টক

ট্রান্স মঙ্গোলিয়ান রেলওয়ে রুট: উলান-উদে – উলানবাতার – বেইজিং

আরও পড়ুন:  নিষিদ্ধ কৈলাস পর্বত রহস্য: যে পর্বত এখনো অজেয়।

বৈকাল আমুর মেইনলাইন রুট: তাইশেত – আমুর নদী – কমসোমলস্ক-না-আমুরে – তাতার প্রণালী – সোভেটস্কায়া গাভান

1 thought on “ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলপথ: পৃথিবীর দীর্ঘতম রেলপথের ইতিহাস।”

Leave a Comment