সাহারা মরুভূমি: পৃথিবীর উষ্ণতম অঞ্চল

বলা হয়ে থাকে সাহারা মরুভূমি পৃথিবীর অন্যতম বড় মরুভূমি। ‘সাহারা’ নামটি আরবি শব্দ থেকে এসেছে যার আক্ষরিক অনুবাদ হল ‘সর্বশ্রেষ্ঠ মরুভূমি’। এর আয়তন প্রায় ৩৫ লক্ষ বর্গমাইল (৯,০৬৪,৯৫৮ বর্গ কি.মি.)। উত্তর আফ্রিকার প্রায় ৩১ ভাগ জুড়ে অবস্থিত এই সাহারা মরুভূমি। এটি আফ্রিকার অনেকগুলো দেশ বিশেষ করে আলজেরিয়া, চাদ, মিশর, লিবিয়া, মালি, মৌরিতানিয়া, মরক্কো, নাইজার, পশ্চিম সাহারা, সুদান এবং তিউনিসিয়া নিয়ে গঠিত। মরুভূমিটির সীমানার কথা বলতে গেলে এর পূর্বে লোহিত সাগর, উত্তরে ভূমধ্যসাগর এবং পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর/এটলাস পর্বতমালা। এর দক্ষিণে রয়েছে নাইজার নদী এবং সাহেল। সাহারা মরুভূমির বেশিরভাগ অঞ্চল জুড়ে রয়েছে শুধু বালি আর বালি। তবে কিছু পর্বতমালা এবং তৃণভূমিও রয়েছে, যদিও এগুলো বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সাহারার প্রধান পর্বতমালা গুলোর মধ্যে রয়েছে সাহারান অ্যাটলাস, তিবেস্তি পর্বতমালা, আহাগার পর্বতমালা, আদ্রার দে ইফোরাস, রেড সি হিলস ইত্যাদি।

সাহারা মরুভুমি: পৃথিবীর উষ্ণতম অঞ্চল

অনেকে সাহারা মরুভূমিকে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহত্তম মরুভূমি মনে করলেও মজার বিষয় হলো এটি আসলে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম মরুভূমি। এই মরুভূমি অঞ্চলটিতে প্রতি বছর ১০ ইঞ্চিরও কম বৃষ্টিপাত হয়। অন্যদিকে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহত্তম মরুভূমির নামটি আরো চমকপ্রদ। মরুভূমির সংজ্ঞা অনুযায়ী যে এলাকায় বছরে ১০ ইঞ্চি (২৫০ মিমি) বা তার কম বৃষ্টিপাত হয় সেগুলোকে মরুভূমির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সংজ্ঞা অনুযায়ী এ তালিকার শীর্ষে রয়েছে এন্টার্কটিকা মহাদেশ। দ্বিতীয়তে রয়েছে পৃথিবীর আর্কটিক অঞ্চল এবং তৃতীয়তে রয়েছে সাহারা মরুভূমি। তবে আয়তনে তৃতীয় হলেও উষ্ণতম অঞ্চলের দিক দিয়ে এর অবস্থান প্রথম। আয়তন হিসাব করলে সাহারা প্রায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আয়তনের সমান আকারের।
সাহারা মরুভূমিতে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় লিবিয়ার আল আজিজিয়া তে ৫৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১৩৬° ফারেনহাইট)।

সাহারা মরুভূমির ইতিহাস

১০০০০ বছর বা তার পূর্বে সাহারা আজকের দিনের মত মরুভূমি ছিল না। প্রায় ১০৫০০ বছর পুর্বে এই অঞ্চল ছিলো সবুজের সমারোহ। তখন সেখানে অনেক বৃষ্টিপাত হতো। পাশাপাশি এই অঞ্চলে বেশ কিছু ছোট-বড় হ্রদ ও নদ-নদীর প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে গবেষকদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী সবচেয়ে অবাক করা বিষয়টি হলো কয়েক কোটি বছর পূর্বে এই জায়গায় ‘থেটিস’ নামক একটি সাগর ছিল। প্রায় চার কোটি বছর আগে পৃথিবীর টেকটনিক প্লেটের স্থান পরিবর্তনের ফলে টেথিস সাগর উত্তর দিকে সরে যায়। যে কারণে আফ্রিকা আর ইউরোপ একে অপরের কাছাকাছি চলে আসে। অতঃপর এই অঞ্চলটি আস্তে আস্তে পানিশূন্য হয়ে যায়। সাহারা মরুভূমি অঞ্চলে যে পূর্বে একটি সাগর ছিলো তার প্রমাণ পাওয়া যায় মিশরে। সাহারা মরুভূমিতে অবস্থিত তিমির উপত্যকা বা ওয়াদি আল হিতান নামে পরিচিত স্থানে তিমির ফসিল পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন:  মাউনা লোয়া: পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আগ্নেয়গিরি।

যাই হোক এবার নিকট ইতিহাসে ফেরত আসা যাক। ৭৫০০ খ্রিষ্টপুর্বাব্দের দিকে এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমতে শুরু করে। যে কারণে বন-জঙ্গলের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে কমতে থাকে। প্রায় ৭০০০ বছর পূর্বে এই অঞ্চলটি মরুভূমিতে রূপ নেয়। এর পিছনে যে কারণকে দায়ী করা হয় তা হচ্ছে মৌসুমী বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তন। প্রতি বিশ হাজার বছর অন্তর অন্তর পৃথিবীতে এ জাতীয় মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তন ঘটে। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া এবং তাপমাত্রা ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ার কারণে এ অঞ্চলের মানুষজন আস্তে আস্তে এ অঞ্চল ছেড়ে দিয়ে অন্য জায়গায় গিয়ে বসতি স্থাপন শুরু করে।

সাহারা মরুভূমির বর্তমান অবস্থা

বিশাল আকারের সাহারা মরুভূমি খুবই বৈচিত্র্যময়। মরুভূমির প্রায় ২৫% জায়গায় রয়েছে বালির টিলা। এর মধ্যে রয়েছে ছোট-বড় উভয় রকমের টিলা। কিছু টিলার উচ্চতা প্রায় ৫০০ ফুটের (১৫২ মিটার) এর বেশি)। বালি ঝড়ের কারণে অনেক সময় এগুলো থেকে বালি সরে যায়, আবার অনেক সময় নতুন টিলার জন্ম হয়।

নীল নদ সাহারার একমাত্র স্থায়ী নদী। অন্যান্য যে পানির উৎস গুলো রয়েছে সেগুলো ঋতু বা জলবায়ুর পরিবর্তনে ভূগর্ভস্থ জলাশয়ের রূপ নেয়। এসব জলাশয় সাহারার ছোট শহর এবং বসতির পানির উৎস হিসেবে কাজ করে। মরুভূমির কেন্দ্রীয় অঞ্চল হচ্ছে সাহারার সবচেয়ে শুষ্ক অঞ্চল, যেখানে খুব সামান্য বৃষ্টিপাত হয় এবং কার্যত কোন গাছপালা নেই। উত্তর ও দক্ষিণ সাহারায় ঝোপঝাড়, তৃণভূমি এবং এমনকী গাছপালা রয়েছে এবং সেখানে বেশি বৃষ্টিপাত হয়। মরুদ্যান এবং নীল নদ উপত্যকায় গাছপালা সহজেই বৃদ্ধি পায়। নীল নদের কাছে জলপাই গাছেরও দেখা মেলে। আপনি আশ্চর্য হতে পারেন যে সাহারার কিছু অঞ্চলের মাটি আশ্চর্যজনকভাবে খুবই উর্বর এবং সেই কারণে যেখানে সেচ দেওয়া সম্ভব সেখানে অনেক ফসল জন্মানো সম্ভব। এছাড়াও সাহারা মরুভূমি জুড়ে অনেক লবণের হ্রদ রয়েছে।

আরও পড়ুন:  অ্যাঞ্জেল জলপ্রপাত: পৃথিবীর উচ্চতম জলপ্রপাত।

সাহারায় কিছু পর্বতমালার দেখাও মেলে। চাদের এমি কাউসি এমনি একটি পর্বত এবং আগ্নেয়গিরির উৎস যা তিবেস্তি পর্বতমালায় অবস্থিত সাহারার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। এর উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১,৩০০ ফুট। এ জাতীয় পর্বতগুলো আসলে যথেষ্ট উঁচু এবং এগুলোতে অন্তত প্রতি ৩ বছর অন্তর অন্তর তুষারের দেখা পাওয়া যায়। তাছাড়াও মিশরের কাতারা নিম্নচাপের গভীরতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪৩৬ ফুট।

সাহারা মরুভূমির উদ্ভিদ

উষ্ণ এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সাহারায় উদ্ভিদের সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম। এই অঞ্চলে প্রায় ৫০০ প্রজাতির উদ্ভিদ জন্মে। এ গাছগুলি সহজেই গরম এবং শুষ্ক আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে অথবা নোনা জলে বেচে থাকতে পারে। এখানে মরুভূমির বিশালতার কারণে জীববৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কম। খেঁজুর, বাবলা গাছ, ঘাস, কাঁটাযুক্ত গুল্ম, তাল ইত্যাদি উদ্ভিদ সাহারার জলবায়ুর সাথে সহজেই খাপ খাইয়ে নিয়েছে। গাছগুলো তাদের কান্ডে পানি জমিয়ে রাখতে পারে এবং তাদের অনুভূমিক শিকড় থাকার কারণে তুলনামূলক সহজে পানি সংগ্রহ করতে পারে। গাছগুলোর পাতা হয় ছোট আর মোটা প্রকৃতির, যার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পানি ধরে রাখতে পারে। আটলান্টিক উপকূলে লাইকেন, রসালো ও গুল্ম জাতীয় গাছপালা সহজেই জন্মাতে পারে।

সাহারা মরুভুমি: পৃথিবীর উষ্ণতম অঞ্চল

সাহারা মরুভূমির প্রাণী

সাহারা মরুভূমিতে আনুমানিক ৭০টি বিভিন্ন প্রাণীর প্রজাতি বাস করে। স্তন্যপায়ী প্রজাতির মধ্যে রয়েছে ফেনেক ফক্স, ফ্যাকাশে শিয়াল, আফ্রিকান বন্য কুকুর, সাহারান চিতা এবং ডোরকাস গাজেল। অভিযোজনের কারণে এরা পানি না খেয়ে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। অ্যাডাক্স হলো সাদা হরিণের একটি প্রজাতি যারা পানি না খেয়ে এক বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। বেশ কিছু প্রজাতির গিরগিটি, টিকটিকি, সাপ এবং বিচ্ছুও এই মরুভূমিতে বসবাস করে। এমনকি মৌরিতানিয়া এবং চাদের কিছু অংশে মরুভূমির কুমিরের পর্যন্ত দেখা মেলে। সাহারার পাখির মধ্যে রয়েছে আফ্রিকান সিলভারবিল এবং কালো গলা ফায়ারফিঞ্চ। বারবাররা এখনও সাহারার বেশিরভাগ অংশে বাস করে। মরুভূমি অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য গৃহপালিত প্রাণী হল উট এবং ছাগল। বিশেষ করে পণ্যপরিবহনে উটের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। যে কারণে উটকে মরুভূমির জাহাজ বলা হয়।

আরও পড়ুন:  নরওয়ে: নিশীথ সূর্যের দেশ বলা হয় যে দেশকে।
সাহারা মরুভুমি: পৃথিবীর উষ্ণতম অঞ্চল

সাহারা মরুভূমির আবহাওয়া এবং জলবায়ু

সাহারার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল গরম ও শুষ্ক জলবায়ু। ১৯২২ সালে লিবিয়ার আজিজিয়াতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়, যা ছিল ১৩৬°F (৫৭.৭°C)। প্রতিবছর গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ১২২°F (৫০°C) ছাড়িয়ে যায়৷ তবে সাহারায় বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ৮৬°F (৩০°C)। বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় যেহেতু বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ কম থাকে সেজন্য বাতাস রাতের বেলা তাপ ধরে রাখতে পারেনা। তাই দিনের বেলা এবং রাতের তাপমাত্রার মধ্যে অনেক পার্থক্য দেখা যায়। রাতে তাপমাত্রা অনেক সময় হিমাঙ্কের নীচে নেমে যায়। আবার বাতাসের তাপমাত্রার চেয়ে সাহারা মরুভূমির বালুর তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি হয়ে থাকে। মধ্য সাহারা যেখানে গাছপালার দেখা পাওয়া যায় না বললেই চলে সেখানে বালির তাপমাত্রা প্রায় ৮০°C পর্যন্ত হয়। সুদানে এখন পর্যন্ত বালুর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৮৩.৫°C ।

বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে, প্রায় অর্ধেক সাহারায় বছরে ০.৭৯ ইঞ্চির (২ সেমি) কম বৃষ্টি হয় এবং বাকি অর্ধেকে প্রায় ৩.৯ ইঞ্চি (৯.৯ সেমি) বৃষ্টিপাত হয়।

অধিবাসী ও অন্যান্য

বসবাসের প্রতিকূল আবহাওয়া থাকায় এই অঞ্চলের জনসংখ্যা মাত্র ২০ লক্ষ এবং বেশিরভাগ মানুষ সাহারা মরুদ্যানে বসবাস করে। পাশাপাশি মরুভূমি হওয়ায় স্বভাবতই সাহারায় অনেক যাযাবর অধিবাসী রয়েছে। সাহারার অধিবাসীদের প্রধান পেশা পশুপালন ও চাষাবাদ। পশুদের মধ্যে প্রধানত তারা উট ও ছাগল পালন করে। পাশাপাশি তারা গম, বার্লি, খেজুর ইত্যাদি চাষ করে জীবনযাপন করে। পাশাপাশি বর্তমানে অনেক স্থানীয় অধিবাসী বিদেশিদের ভ্রমণ গাইড হিসেবেও জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।

সাহারা মরুভুমি: পৃথিবীর উষ্ণতম অঞ্চল

সাহারার মরুভূমির অনেক জায়গা, বিশেষ করে লিবিয়া এবং আলজেরিয়ায় প্রচুর তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া গেছে। তাছাড়া বিভিন্ন ধরনের ধাতব খনিজ দ্রব্যও এই অঞ্চলে পাওয়া যায়।

যাই হোক, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সাহারার আয়তন এবং তাপমাত্রা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে বিজ্ঞানীদের ধারনা অনুযায়ী, মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের পুনঃপরিবর্তনের ফলে ১৫,০০০ বছর পর সাহারা পুনরায় সবুজ বনভূমিতে পরিনত হবে!

Leave a Comment