নিষিদ্ধ কৈলাস পর্বত রহস্য: যে পর্বত এখনো অজেয়।

তিব্বতের মালভূমিতে অবস্থিত কৈলাস পর্বত টি ২১,৭৭২ ফুট (৬,৬৩৮ মিটার) উচ্চতার একটি সুবিশাল পর্বত। এটি অনেকের কাছে পৃথিবীর কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তাছাড়া হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং বন ধর্মের জন্য অত্যন্ত পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত এটি। হাজার হাজার তীর্থযাত্রী প্রতি বছর চূড়ার চারপাশে হাঁটার জন্য সেখানে যায়, কিন্তু কেউ কখনো এর চূড়ায় উঠতে পারে নি। বরফে ঘেরা নয়নাভিরাম দৃশ্য, সুন্দর হ্রদ, হিমালয় পর্বতমালা এবং তিব্বতীয় সংস্কৃতি বিশ্বের বিভিন্ন জায়গার পর্যটকদের এই জায়গাটি দেখতে আকৃষ্ট করে।

নিষিদ্ধ কৈলাশ পর্বত রহস্য: যে পর্বত এখনো অজেয়
কৈলাস পর্বত

কৈলাস শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত শব্দ কেলাস (Crystal) থেকে। এর কারণ হল বরফে ঢাকা কৈলাসকে দেখে অনেকটা স্ফটিক মনে হয়। তিব্বতি ভাষায় কৈলাশকে বলা হয় গাঙ্গো রিনপোচে। ‘রিনপোচে’ শব্দটির অর্থ হল বরফের তৈরি দামী রত্ন।

কৈলাস পর্বত কোথায় অবস্থিত?

কৈলাস পর্বতটি তিব্বতের সুদূর পশ্চিমে এনগারি অঞ্চলে অবস্থিত। এটি তিব্বতের কেন্দ্রীয় লাসা থেকে প্রায় ৯৫৫ কিলোমিটার দূরে। তিন দিন গাড়ি চালিয়ে লাসা থেকে কৈলাস অঞ্চলে পৌঁছানো যায়। কৈলাস পর্বতে পৌঁছানোর প্রধান পথটি কেরুং সীমান্ত দিয়ে নেপাল থেকে ৬১৭ কিলোমিটার। কৈলাসের কাছের একমাত্র বিমানবন্দরটি আলি গুনসা বিমানবন্দর, যা কৈলাস মানস সরোবর থেকে প্রায় ৩৩০ কিলোমিটার দূরে।

My bangla blog এর সকল পোস্ট গুগল নিউজে পেতে ভিজিট করুন এখানে Google news

কৈলাস পর্বতে কি আছে?

কৈলাস পর্বত হল নেপাল ও ভারতের কাছে তিব্বতের পশ্চিম অংশের সর্বোচ্চ তুষার শৃঙ্গ। কৈলাসের ভিতরে এবং আশেপাশে অনেক আকর্ষণীয় স্থান রয়েছে।

  • তুষারে ঘেরা কৈলাস পর্বত হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং বন ধর্মাবলম্বীদের প্রভুর উপাসনার স্থান বলে বিবেচিত হয়।
  • মানস সরোবর হ্রদ (কৈলাস থেকে ৩০ কিমি দক্ষিণে) এবং পাশের রাক্ষস হ্রদ
  • চারটি প্রধান নদীর উৎস (কর্ণালী, ব্রহ্মপুত্র, সুতলজ ও সিন্ধু)   
  • ডেরাপুক (কৈলাস পর্বতের উত্তর মুখ) থেকে চরণস্পর্সা যাওয়ার রাস্তা
  • কৈলাসের ভেতরের সপ্তর্ষি গুহা
  • আত্মলিঙ্গম (কৈলাস পর্বতের ভিত্তি)
  • কৈলাসের সামনে নন্দী পাহাড় (দেবতা শিবের একটি বাহন – নন্দীর মতো)  
  • তীর্থপুরী (কৈলাশ পর্বতের উত্তর-পশ্চিমে এবং দারচেন থেকে ৬৫ কিমি পশ্চিমে সুতলজ নদীর তীরে)
  • কৈলাসকে ঘিরে থাকা প্রাচীন এবং বিখ্যাত মঠগুলি হল দ্রিরাপুক মঠ, চুই গোম্পা, জুথুলপুক মঠ, সেলুং এবং গিয়াংঝা মঠ।
নিষিদ্ধ কৈলাশ পর্বত রহস্য: যে পর্বত এখনো অজেয়
মানস সরোবর

কেন কৈলাস পর্বতে চড়ার অনুমতি দেয়া হয় না?

কৈলাস পর্বতে এখনও আরোহণ করা সম্ভব হয়নি মূলত ধর্মীয় সম্মানের কারণে। কোনো তীর্থযাত্রী কৈলাস পর্বতে আরোহণ করেন না। চারটি ধর্মই (হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং বন) বিশ্বাস করে যে এর ঢালে পা রাখা একটি গুরুতর অসম্মানজনক কাজ হবে। কথিত আছে যে একমাত্র ব্যক্তি যিনি ঐ চূড়ায় পৌঁছেছেন তিনি হলেন বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী মিলরেপা। তিনি সেখানে এমন কিছু দেখেছেন যার জন্য অন্য কাউকে সেখানে যেতে নিষেধ করেছেন। তিব্বত সরকার ও বর্তমান চীন সরকার এই পাহাড়ে আরোহণের কোনো অনুমতি দেয় না এবং পবিত্র ভূমিতে যেকোনো অবৈধ কার্যকলাপ এড়াতে প্রত্যেক পর্যটিকের জন্য কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে।

আরও পড়ুন:  ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলপথ: পৃথিবীর দীর্ঘতম রেলপথের ইতিহাস।

কৈলাস পর্বত এর কিছু অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা

• অনেকে মনে করেন পিরামিড-আকৃতির কৈলাস পর্বত অতিমানবীয় ঐশ্বরিক শক্তির প্রভাবে সৃষ্টি হয়েছে।

• বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অনুসারে, কৈলাস পর্বতের চারপাশে প্রাচীন মঠ এবং গুহা রয়েছে যেখানে পবিত্র ঋষিরা বসবাস ও ধ্যান করেন। এই গুহাগুলি শুধুমাত্র ভাগ্যবান ব্যক্তিরাই দেখতে পারেন।

• কিছু সাহসী পর্বতারোহী এর চূড়ায় আরোহণের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কেউই সফল হতে পারেননি।

• পাহাড়ের পবিত্রতা লঙ্ঘনের ভয়ে এবং সেখানে বসবাসকারী ঐশ্বরিক শক্তিকে বিরক্ত করার ভয়ে কৈলাস পর্বতের চূড়া পর্যন্ত ট্র্যাকিং করা ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ কাজ বলে মনে করা হয়। একটি তিব্বতীয় উপাখ্যান অনুসারে, মিলরেপা নামে এক সন্ন্যাসী একবার কৈলাশ পর্বতের চূড়ায় পৌছাতে পেরেছিলেন। যখন তিনি ফিরে আসেন, তিনি সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যাতে কেউ আর সেখানে না যায়।

• মানস সরোবর এবং রাক্ষসতাল নামে দুটি সুন্দর হ্রদ কৈলাস পর্বতের গোড়ায় অবস্থিত। দুটির মধ্যে, মানস সরোবর, যা ১৪,৯৫০ ফুট, (৪,৫৯০ মিটার) উচ্চতায় অবস্থিত, এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ স্বাদুপানির উৎস হিসাবে বিবেচিত হয়। পাশাপাশি দুটো হ্রদ হলেও রাক্ষসতাল হ্রদটি নোনা জল ধারণ করে।

আরও পড়ুন:  মৃত সাগর বা ডেড সী: যে সাগরে মানুষ ডুবে না।

• ধর্মীয় মতে কৈলাস পর্বতকে মহাজাগতিক অক্ষ, বিশ্বস্তম্ভ, বিশ্বের কেন্দ্র বলে বিশ্বাস করা হয়। এটি সেই বিন্দু যেখানে স্বর্গ পৃথিবীর সাথে মিলিত হয়।

• পবিত্র হ্রদ মানস সরোবরের জল বাতাস হোক বা না হোক সবসময় শান্ত থাকে। অপরদিকে পাশের হ্রদ রাক্ষসতাল সবসময়ই কমবেশি অশান্ত থাকে।

•  তীর্থযাত্রীদের ভাষ্যমতে, কৈলাশ পর্বতে ভ্রমনকালে তারাতাড়ি বার্ধক্য আসে। আপনি যদি সেখানে অন্তত ১২ ঘন্টা সময় অতিবাহিত করেন তাহলে আপনার চুল ও নখ অন্তত দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পাবে। ধারনা করা হয় কৈলাশের আবহাওয়া এবং বাতাস বার্ধক্যের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। 

• কথিত আছে, একবার সাইবেরিয়ান বংশোদ্ভূত পর্বতারোহীদের একটি দল কৈলাশের সর্বোচ্চ চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছেছিল। অতঃপর তাদের বয়স অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এক বছর পর তাদের সবাই মারা যায়।

(বি:দ্র: এর সবগুলোই লোক-কাহিনী হিসেবে পরিচিত, বিজ্ঞান এগুলো সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি)

কৈলাস পর্বত ভ্রমণের সেরা সময়

কৈলাস ভ্রমণের সেরা সময় জুন থেকে আগস্ট মাস। মে মাসেও ভ্রমন করা যায় তবে তখনও সেখানে ঠান্ডা থাকে। সেপ্টেম্বর মাস থেকে আবারও ঠান্ডা ও বরফ পড়া শুরু হয়। কৈলাস ভ্রমন যাত্রা শুরু হয় মে মাসের মাঝামাঝি থেকে এবং চলে সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত। এ অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে তূলনামূলক কম বৃষ্টি হয়। শীতকালে পুরো অঞ্চল বরফে ঢেকে যায়। কৈলাসের সবচেয়ে শীতল মাস ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। মার্চ, এপ্রিল থেকে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত কৈলাশ পরিক্রমা পথে বরফ থাকে।

Leave a Comment