ঐতিহাসিক পানামা খাল তৈরির ইতিহাস।

ঐতিহাসিক পানামা খাল আটলান্টিক মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে সংযোগ সৃষ্টিকারী একটি খননকৃত কৃত্রিম খাল। মধ্য আমেরিকার পানামায় অবস্থিত বলে একে পানামা খাল বলা হয়। খালটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৮ মাইল (৭৭ কিলোমিটার)। তবে মজার বিষয় হয় হল, খালটি খনন করা না হলে সমুদ্র পথে খালটির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে হলে প্রায় ৮০০০ মাইল বা ১২৮৭৫ কিলোমিটার পথ বাঁচিয়ে দেয়।

ঐতিহাসিক পানামা খাল তৈরির ইতিহাস।


পঞ্চদশ শতাব্দী থেকেই পানামার ইস্তমাসে খাল তৈরির চিন্তা ভাবনা শুরু হয়। তবে নির্মাণের চেষ্টা করা দেশগুলোর মধ্যে প্রথমেই যে দেশের নাম আসবে, সে দেশের নাম হচ্ছে ফ্রান্স। যাদের উপর খাল তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয় সেই দলের প্রধান ছিলেন মিশরের সুয়েজ খালের নির্মাতা কাউন্ট ফার্দিনান্দ ডি লেসেপস। এই পরিকল্পনাটি হয় ১৮৮০ এর দশকে। তবে সে সময় ইয়েলো ফিভার এবং ম্যালেরিয়ার ব্যপক প্রকোপের কারণে, পাশাপাশি পর্যাপ্ত তহবিলের অভাবে পরিকল্পনাটি সফল হয় নি।
১৮৫০ সাল থেকে এবং ১৮৭৫ সালের বিভিন্ন জরিপের মতে তখন মধ্য আমেরিকায় জলপথে পন্য সরবারাহের মাত্র দুটি রুট ছিল। এর একটি পানামায় এবং অন্যটি নিকারাগুয়ায়। ১৮৯৯ সালে মার্কিন কংগ্রেস সেন্ট্রাল আমেরিকায় খাল খননের প্রয়োজনীয়তাসহ যাবতীয় দিক পর্যবেক্ষণ করার জন্য ‘ইস্তমিয়ান ক্যানেল কমিশন’ গঠন করে। কমিশন প্রথমে নিকারাগুয়ার মধ্য দিয়ে খাল খননের সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু পরে এই পরিকল্পনা বাতিল করে।

১৯০৪ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি থিওডোর রুজভেল্ট নবগঠিত পানামার সাথে হে-বুনাউ-ভ্যারিলা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পানামার স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয় এবং বিনিময়ে পানামা খাল খনন, মেইন্টেনেন্স সহ যাবতীয় কতৃক নিজেদের কাছে নেয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ১৯১৩ সালে শুরুতে পানামাকে ১০ মিলিয়ন ডলার এবং বার্ষিক ২৫০,০০০ ডলার অর্থ ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল। যে স্ট্রিপটি ঘিরে চুক্তিটি হয়েছিল তা এখন পানামা খাল অঞ্চল হিসাবে পরিচিত।

আরও পড়ুন:  সেন্ট হেলেনা: নেপোলিয়নের নির্বাসনের দ্বীপ। Saint helena

১৯০৬ সালে একটি লক খাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। প্রথম তিন বছর নির্মাণ সম্পর্কিত যাবতীয় সবকিছু যাচাই-বাছাই করা হয়। ১৯০৯ সালের আগস্ট মাসে নির্মাণ কাজ পুরো দমে শুরু হয়। প্রতিটি লক চেম্বার প্রায় ১১০ ফুট প্রস্থ এবং ১০০০ ফুট লম্বা ছিল। এগুলো কালভার্টের সাথে এমন ভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল যাতে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে জলের স্তর বাড়ানো ও কমানো যায়।

১৯১৪ সালের ১৫ আগস্ট খালটি জাহাজ চলাচলের উপযোগী হয় এবং ১৯২০ সালের ১২ই জুলাই এটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়। খাল খননে প্রায় ২৪০ মিলিয়ন ঘনমিটার মাটি উত্তোলনের প্রয়োজন হয় এবং সর্বমোট খরচ হয় প্রায় ৩৩৬,৬৫০,০০০ ডলার।

ঐতিহাসিক পানামা খাল তৈরির ইতিহাস।

১৯৩৯ সালে আমেরিকা-পানামা চুক্তির সংশোধনী অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ বার্ষিক ৪৩৪,০০০ ডলারে উন্নীত হয়। একই বছরে আমেরিকান কংগ্রেস ক্যানেলে তৃতীয় লক নির্মাণের পরিকল্পনা করে। তবে সে বছর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ায় পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়। ১৯৫৫ সালে খাল থেকে আয় ১,৯২০,০০০ ডলারে উন্নীত হয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খালের প্রশান্ত মহাসাগরীয় দিকে একটি উচ্চ স্তরের সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ১৯৬৯ সালে দ্বিমুখী যান চলাচলের জন্য গেইলার্ড কাট নামক একটি কৃত্রিম ভ্যালি প্রশস্ত করা হয়।

আরও পড়ুন:  সেন্টিনেলিজ জাতি: নিষিদ্ধ সেন্টিনেল দ্বীপের আদিবাসী।

১৯৭৭ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার এবং পানামা নেতা ওমর টোরিজোস কর্তৃক একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী খালটিকে একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক জলপথ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয় এবং এমনকি যুদ্ধের সময়ও যে কোনও জাহাজ নিরাপদে যাতায়াতের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। ১৯৯৯ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ সম্পুর্নভাবে পানামার কাছে হস্তান্তর করা হয়।

খালটির তিনটি লক দিয়ে জাহাজ অতিক্রম করতে প্রায় ১৫ ঘন্টা সময় লাগে (ট্রাফিকের কারণে আরও প্রায় অর্ধেক সময় অপেক্ষা করতে হয়)। আটলান্টিক মহাসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে খালের মধ্য দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলি পানামার ইস্টমাসের পূর্ব-পশ্চিম অভিমুখের কারণে উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে চলে যায়।
২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে পানামা খাল সম্প্রসারণের জন্য ৫.২ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। পানামা খাল সম্প্রসারণ প্রকল্পটি ২০১৬ সালের ২৬শে জুন 26 জুন সম্পূর্ণরূপে সমাপ্ত হয়। কার্যকরী এই প্রকল্পের ফলস্বরূপ বর্তমানে প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ জাহাজ একসাথে খালের মধ্য দিয়ে যেতে পারে , যে কারণে এ রাস্তায় পণ্য পরিবহনের পরিমাণও বেড়ে গিয়েছে।

পৃথিবীর ইতিহাসে এতবড় মানবসৃষ্ট কাজের নজির খুব কমই আছে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের দ্বারা নির্মিত আন্ত-মহাসাগরীয় পানামা খালটিকে আমেরিকান সোসাইটি অফ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স আধুনিক বিশ্বের সাতটি আশ্চর্যের একটি হিসাবে স্বীকৃতি দেয়।

আরও পড়ুন:  ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলপথ: পৃথিবীর দীর্ঘতম রেলপথের ইতিহাস।

পানামা খাল সম্পর্কিত কয়েকটি প্রশ্ন ও উত্তর:

১. পানামা খাল কে নির্মাণ করেন এবং কেন?

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট পানামার সাথে হে-বুনাউ-ভ্যারিলা চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পানামা খাল অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ পায়। ট্রান্স ইসথমিয়ান খাল নির্মাণের তত্ত্বাবধানও করেছিলেন রুজভেল্ট। এটি আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে পণ্য পরিবহনের সময় এবং পরিবহন খরচ কমানোর জন্য নির্মিত হয়েছিল।

২. পানামা খালের মালিক কোন দেশ?

১৯৯৯ সালে যৌথ মার্কিন-পানামানিয়ান কমিশন থেকে অধিকার হস্তান্তর করার পর থেকে পানামা খালটি পানামা প্রজাতন্ত্রের মালিকানাধীন এবং পরিচালিত।

৩. কেন পানামা খাল একটি সফল প্রকল্প ছিল?

পানামা খাল প্রকল্প সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং ভ্রমণ ব্যাবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। এটি আমেরিকার পূর্ব উপকূল থেকে পশ্চিম উপকূলে ট্রানজিটের সময়কে অর্ধেকে কমিয়ে দিয়েছে। এটি বিশ্বের একটি প্রযুক্তিগত বিস্ময়, সেজন্য আমেরিকান সোসাইটি অফ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স এটিকে আধুনিক বিশ্বের সাতটি আশ্চর্যের একটি বলে অভিহিত করেছে।

৪. পানামা খাল নির্মাণের সময় কতজন শ্রমিক মারা গিয়েছিল?

পানামা খাল নির্মাণ ছিল বেশ কঠিন, চ্যালেঞ্জিং এবং বিপজ্জনক। বার্বাডোস, মেরিটিনিক, গুয়াদেলুপ থেকে আগত বেশিরভাগ শ্রমিক ছিল দরিদ্র। খালটি নির্মাণের সময় প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছিলেন।

Leave a Comment