ব্যাবিলন কোথায় অবস্থিত? ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান কে নির্মাণ করেন?

ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান বিশ্বের সাতটি প্রাচীন আশ্চর্যের একটি ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে রাজা দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার তার স্ত্রী পারস্য রাজকন্যা অ্যামাটিসের জন্য তৈরি করেছিলেন সেই বিখ্যাত ঝুলন্ত উদ্যান। নেবুচাদনেজার তাকে মরুভূমিতে একটি মরূদ্যান তৈরি করেছিলেন। সেখানে বিদেশী গাছপালা দিয়ে আচ্ছাদিত একটি দালান তৈরি করেছিলেন যাতে পাহাড়ের কারুকার্যও ছিল। তবে ঝুলন্ত উদ্যান নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।

ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান কি সত্যিই ছিলো
Source: Wikimedia.org

দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার এবং ব্যাবিলন

ব্যাবিলন শহরটি ইরাকের আধুনিক শহর বাগদাদের দক্ষিণে ইউফ্রেটিস নদীর কাছে ২৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি বা তারও আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যেহেতু এটি মরুভূমিতে অবস্থিত, সেজন্য প্রায় সম্পূর্ণ কাদামাটি এবং ইট দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। যেহেতু ইট সহজেই ভাঙ্গা যায়, তাই ইতিহাস জুড়ে শহরটি বহুবার ধ্বংস হয়েছে।

My bangla blog এর সকল পোস্ট গুগোল নিউজে পেতে ভিজিট করুন এখানে Google news

খ্রিস্টপূর্ব ৭ম শতাব্দীতে ব্যাবিলনীয়রা তাদের অ্যাসিরিয়ান শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। সেই বিদ্রোহের জের ধরে অ্যাসিরিয়ান রাজা সেন্নাকেরিব ব্যাবিলন শহরটিকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। আট বছর পর রাজা সেনাকেরিব তার তিন ছেলের হাতে নিহত হন। মজার বিষয় হল, এই পুত্রদের একজন ব্যাবিলন পুনর্গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন:  অলিম্পিয়ার জিউসের মূর্তি: প্রাচীন গ্রীক শিল্পের এক স্মৃতিস্তম্ভ।

ব্যাবিলন আবার পুনর্গঠিত হওয়ার পরে দ্রুতই শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত হয়। তখনকার রাজা ছিলেন নেবুচাদনেজারের পিতা রাজা নবোপোলাসার, যিনি ব্যাবিলনকে অ্যাসিরিয়ান শাসন থেকে মুক্ত করেছিলেন। ৬০৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার যখন রাজা হন, তখন তিনি তার রাজ্যকে আরও বাড়াতে চেয়েছিলেন।

নেবুচাদনেজার তার রাজ্যকে অনেক বিস্তৃত করতে চেয়েছিলেন যাতে এটি সেই সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী নগর-রাষ্ট্রগুলির মধ্যে একটি হয়ে উঠে। তিনি মিশরীয় এবং অ্যাসিরিয়ানদের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন এবং জয়লাভ করেছিলেন।

যুদ্ধে বিজয়ের পর সেখানকার প্রচুর ধন-রত্ন লুট করে নিয়ে আসেন যা নেবুচাদনেজার তার ৪৩ বছরের রাজত্বকালে ব্যাবিলন শহরের উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করেছিলেন। তিনি একটি বিশাল জিগুরাত, মারদুকের মন্দির তৈরি করেছিলেন (মারদুক ছিলেন ব্যাবিলনের দেবতা)। তিনি শহরের চারপাশে একটি বিশাল প্রাচীরও তৈরি করেছিলেন যা প্রায় ৮০ ফুট পুরু। দেয়ালগুলি এত বড় এবং মহিমান্বিত ছিল- বিশেষ করে ইশতার গেট, যার জন্য সেটিকে বিশ্বের সাতটি প্রাচীন আশ্চর্যের মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচনা করা হত।

ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান দেখতে কেমন ছিল?

অতিত ইতিহাস থেকে ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান সম্পর্কে খুব কম তথ্যই জানা গিয়েছে। এটি ঠিক কোথায় অবস্থিত সেটা এখন পর্যন্ত অজানা। পানি প্রবেশের সুবিধার জন্য এটিকে ইউফ্রেটিস নদীর কাছে স্থাপন করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়, তবে এর কোনো সঠিক প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এটিই একমাত্র প্রাচীন আশ্চর্য যার অবস্থান এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন:  ক্যাপাডোসিয়া: তুরস্কে মাটির নিচে শহর রয়েছে যেখানে।

প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে রাজা দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার তার স্ত্রী অ্যামাটিসের জন্য সেই ঝুলন্ত উদ্যান তৈরি করেছিলেন। কারণ তার স্ত্রী মরুভূমির পরিবেশে অভ্যস্ত ছিলেন না এবং পারস্যের শীতল তাপমাত্রা, পাহাড়ী ভূখণ্ড এবং তার জন্মভূমির সুন্দর দৃশ্য সেখানেও চেয়েছিলেন।

ধারনা করা হয় যে ঝুলন্ত উদ্যানটি ছিল একটি লম্বা দালান, যা পাথরে নির্মিত (সেখানকার বিরল পাথর)। সম্ভবত অনেক সিড়ি থাকার কারণে সেটি কোনো না কোনোভাবে পাহাড়ের মতো দেখতে ছিল। দেয়ালের উপর ঝুলানো ছিল অসংখ্য এবং বৈচিত্র্যময় গাছপালা। মরুভূমিতে বিদেশী গাছগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রচুর পরিমাণে পানির দরকার হত। ধারনা করা হয় যে, একধরনের ইঞ্জিন ভবনের নীচে অবস্থিত ছিল যার মাধ্যমে  কূপ বা সরাসরি নদী থেকে পানি তোলা হত।

ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান কি সত্যিই ছিলো
Source: alamy.com

ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান কি সত্যিই ছিল?

ঝুলন্ত উদ্যানের অস্তিত্ব নিয়ে এখনও অনেক বিতর্ক রয়েছে। ঝুলন্ত উদ্যানের বর্ননা শুনে সেটা আপাতদৃষ্টিতে আশ্চর্যজনক ও অবাস্তব মনে হয়। তারপরেও ব্যাবিলনের কাঠামোর অনেক কিছুই প্রত্নতাত্ত্বিকরা খুঁজে পেয়েছেন এবং ধারণা করছেন যে সত্যিই এর অস্তিত্ব ছিল।

কিছু প্রত্নতাত্ত্বিকের মতে ব্যাবিলনের ধ্বংসাবশেষ এবং প্রাচীন কাঠামোর অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। তবে এগুলো ইউফ্রেটিস নদীর কাছাকাছি নয় বলে ধারণা করা হয়।

আরও পড়ুন:  চিচেন ইতজা: প্রাচীন মায়ান সভ্যতা। Chichen Itza - My bangla blog

এছাড়াও ব্যাবিলনীয় সময়ের কোন সমসাময়িক লেখায় ঝুলন্ত উদ্যানের উল্লেখ নেই। এর ফলে কেউ কেউ বিশ্বাস করে যে ঝুলন্ত উদ্যান একটি পৌরাণিক কাহিনী ছিল, যা ব্যাবিলনের পতনের পরে শুধুমাত্র গ্রীক লেখকদের দ্বারা বর্ণিত হয়েছিল।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. স্টেফানি ডালি কর্তৃক প্রস্তাবিত একটি নতুন তত্ত্ব বলে যে ঝুলন্ত উদ্যানগুলি ব্যাবিলনে অবস্থিত ছিল না; বরং এগুলো উত্তরের আসিরীয় শহর নিনেভাতে অবস্থিত ছিল এবং রাজা সেন্নাকেরিব এগুলো নির্মান করেছিলেন। এটি প্রকৃতপক্ষেই বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে কারণ নিনেভা এক সময় নিউ ব্যাবিলন নামে পরিচিত ছিল।

তবে ঝুলন্ত উদ্যানের মত আশ্চর্যজনক স্থাপনা ইরাকের নিনেভার মত যুদ্ধ-বিরোধে পরিপূর্ণ জায়গায় স্থাপন করা সম্ভব হয়েছিল কিনা তা নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। হয়তো একদিন আমরা ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান সম্পর্কে প্রকৃত সত্য জানতে পারব।

Leave a Comment