শায়েস্তা খান: টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত যার সময়ে।

শায়েস্তা খান এর নাম শুনলে প্রথমেই মাথায় আসে টাকায় আট মণ চালের কথা। এটা ঠিক যে সে সময় জিনিসপত্রের মূল্য অনেক অনেক ছিল। তবে এটাও মাথায় রাখতে হবে যে সেসময় এক টাকা রোজগার করাও এখনকার চাইতে অনেক কষ্টসাধ্য ছিল।
যাই হোক মুঘল শাসনামলে যে ব্যক্তিবর্গ বাংলা শাসন করেছেন তার প্রথম দিকেই থাকবে শায়েস্তা খানের নাম। তিনি ছিলেন বাংলার প্রাদেশিক শাসক বা সুবেদার। তিনি দুই দফায় ২৪ বছর বাংলা শাসন করেন। তিনি প্রথমবার ১৬৬৪ সাল থেকে ১৬৭৮ সাল পর্যন্ত এবং দ্বিতীয়বার ১৬৮০ থেকে ১৬৮৮ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন।

শায়েস্তা খান: টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত যার সময়ে।
শায়েস্তা খান

প্রাথমিক জীবন

শায়েস্তা খানের আসল নাম মির্জা আবু তালিব। তার দাদা ছিলেন গিয়াস উদ্দিন বেগ এবং পিতা ছিলেন ইরানি বংশোদ্ভুত আসফ খান। তার আরও একটি বিশেষ পরিচয় ছিল। তিনি ছিলেন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মামা ও সম্রাট শাহজাহানের শ্যালক। তার দাদা গিয়াস উদ্দিন এবং বাবা আসফ খান উভয়ই সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং শাহজাহানের উজিরের দায়িত্বে ছিলেন।
প্রাথমিক জীবনে তিনি মুঘল সেনাবাহিনীতে চাকরি ও প্রশিক্ষণ নেন। পদোন্নতি পেয়ে তিনি বিভিন্ন প্রদেশের সুবেদার এর দায়িত্বে নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে সম্রাট শাহজাহান তাকে সেনাপতি পদে অধিষ্ঠিত করেন। মুঘল শাসনামলে অবদান রাখার কারণে সম্রাট শাহজাহান মির্জা আবু তালিব কে ‘শায়েস্তা খা’ উপাধিতে ভূষিত করেন। সেনাপতি হিসেবে দাক্ষিণাত্যে গোলকুন্ডার কুতুবশাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দায়িত্ব পালন কালে তিনি আওরঙ্গজেবের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেন। পরবর্তীতে আওরঙ্গজেবের শাসনামলে তিনি উচ্চ মর্যাদাবিশিষ্ট পদে অধিষ্ঠিত হন। সম্রাট আওরঙ্গজেব তাকে আমির-উল-উমারা বা অভিজাতদের প্রধান উপাধি দেন।
বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হওয়ার পূর্বে শায়েস্তা খান সম্রাট দরবারের প্রধানমন্ত্রী, বিহার, গুজরাট, দক্ষিণাত্যের সুবেদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে মীরজুমলার মৃত্যু পর ১৬৬৪ সালে শায়েস্তা খান বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হন।
তার ছয় পুত্র শাসনকার্যে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করতেন। মীরজুমলার মৃত্যুর পর সাময়িকভাবে প্রশাসনে যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় শায়েস্তা খান কঠোর হস্তে দমন করেন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে ছিল প্রশাসনিক সংস্কার, কর্মচারীদের দুর্নীতি রোধ করা এবং জোরপূর্বক কর প্রথা বিলুপ্ত করা। তার কঠোর নিয়মনীতির কারণে বাংলার জমিদার ও অসৎ কর্মকর্তারা সবসময় ভীত থাকতো। এতে করে সহজেই তিনি প্রশাসনিক ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন।

আরও পড়ুন:  মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক: আধুনিক তুরস্কের রুপকার।

চট্টগ্রামের জলদস্যুদের বিতাড়ন

চট্টগ্রামের মগ জলদস্যুদের বিতাড়ন শায়েস্তা খানের অনন্য কৃতিত্বগুলোর একটি। সুবেদারকে প্রথমেই যে বিরাট সমস্যার মোকাবেলা করতে হলো, তা হচ্ছে চট্টগ্রামে মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যুদের বর্বরতা। পূর্ব বাংলার আগের সুবেদার এবং সম্রাট শাহজাহানের পুত্র সুলতান শুজার প্ৰতি আরাকান রাজের ক্ষোভ ছিল। যার কারণে আরাকান রাজের প্রশ্রয় পেয়ে মগদের ঔদ্ধত্য এবং দৌরাত্ম্য বাড়তে থাকে। তাদের লুটপাটের কারণে সাধারণ জনগণ সবসময় আতঙ্কে থাকতো। এমনকি ঢাকার দৃষ্টিসীমার মধ্যে এসেও তারা অবাধে চালাতে থাকে তাদের লুণ্ঠন আর ধ্বংসলীলা। শায়েস্তা খানের শাসনভার নেওয়ার চার বছর আগে মীর জুমলা ঢাকায় রাজধানী ফিরিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু তার সংক্ষিপ্ত শাসনকাল কুচবিহার ও আসাম অভিযানেই বায়িত হয়। মগ ও পর্তুগীজদের সাথে দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অবসান ঘটানোর ভার যেনো শায়েস্তা খার জন্যই ঠিক করা ছিল। জলদস্যুদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারলে ইংরেজরা এর সুবিধা পাবে, এটা আন্দাজ করতে পেরে শায়েস্তা খান ইংরেজ কুঠিয়ালদের তাদের গোলন্দাজ সেনাদল পাঠানোর জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু ইংরেজগণ এখানকার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করার, আরো বিশেষ ভাবে বললে কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহে জড়াতে চায় নি। যার ফলে শায়েস্তা খান পরবর্তীতে ওলন্দাজদের সাহায্য চান। তিনি ব্যাটাভিয়ায় দূত পাঠিয়ে জলদস্যুদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলার এবং আরাকান রাজ্য অভিযানে সহযোগিতা করার জন্যে অনুরোধ জানান। ওলন্দাজদের তখন পর্তুগীজদের সাথে এমনিতেই বিরোধ ছিল, যার জন্য তারা শায়েস্তা খাঁর প্রস্তাবে তৎক্ষণাৎ সম্মতি দেয় এবং বঙ্গোপসাগরে মোগল নৌবহরের সাথে মিলিত হওয়ার জন্যে দুটি বৃহৎ রণতরী প্রেরণ করেন। তবে নানা প্রকার ভীতি ও কিছু প্রতিশ্রুতির কারণে সন্দ্বীপের পর্তুগীজগণ ইতিমধ্যেই বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। যার কারণে ওলন্দাজদের সাহায্য তখন আর দরকার পড়েনি।
পর্তুগিজদের সাথে সমঝোতার পর মগদের বিরুদ্ধে অভিযান চালনোর জন্য ঢাকায় এক বিরাট বাহিনী গড়ে তুললেন। বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রস্তুত করা হয় প্রায় ৩০০ যুদ্ধজাহাজ। এগুলোতে রইলো প্রয়োজনীয় সমরোপকরণ এবং নৌ-সৈন্যদল। প্রায় ৪৩০০০ সৈন্যবাহিনীর কয়েকটি দল জল ও স্থলপথ দিয়ে একসাথে মগদের আক্রমণ করে। বাধ্য হয়ে মগ জলদস্যুরা বাংলা থেকে পলায়ন করতে বাধ্য হয়।
কষ্টার্জিত এই বিজয়ের পর শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম জয়ের পথকে সহজতর করার জন্য এক উপায় অবলম্বন করলেন। যে সব পর্তুগীজ সেনাদের আরাকান রাজের সাথে সখ্যতা ছিল তিনি তাদের নানা প্রকার সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আরকান রাজের চাকরি থেকে নিজের দলে নিয়ে আসেন। তাদের অনেক সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি ভয়ভীতি দেখানো হয়। ফলে পর্তুগিজরা উপলব্ধি করতে পারে যে তাদের লুটপাট আর দস্যুবৃত্তির দিন শেষ হয়ে এসেছে। কাজেই তারা গোপনে আরাকান রাজ্য ত্যাগ করে শায়েস্তা খানের দলে ভিড়তে থাকে। এর মাধ্যম বাংলার জনগণ জলদস্যুদের অত্যাচার চিরতরে থেকে পরিত্রাণ পায়। যুদ্ধে জয়লাভের পর চট্টগ্রামের নাম পরিবর্তন করে ইসলামাবাদ করেন।

আরও পড়ুন:  কনফুসিয়াস: একজন চীনা দার্শনিকের জীবনদর্শন।

শায়েস্তা খান: টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত যার সময়ে।
লাল বাগ কেল্লা

অর্থনৈতিক অবস্থা

চট্টগ্রামের অভিযান বাদ দিলে বাংলায় শায়েস্তা খাঁর পুরো শাসনকালটিই ছিলো শান্তিপূর্ণ। তার সময় বাংলা অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক উন্নতি লাভ করে। প্রচুর পরিমাণে পণ্য রপ্তানি হতে থাকে। যার মধ্যে প্রধান ছিল বস্ত্র। বস্ত্রের মধ্যে তখন বিখ্যাত ছিল মসলিন, সিল্ক, সুতীবস্ত্র ইত্যাদি। তাছাড়া প্রবাল, স্ফটিক, শঙ্খ, ভোঁদড় চর্ম ও শাঁখের চুড়ি ইত্যাদিও রপ্তানি করা হতো। বাংলাদেশ থেকে বস্ত্র নিয়ে বিদেশী বণিকরা বহু দেশে, বিশেষ করে জাপানে ও ইউরোপে রফতানী করতো। তাদের মধ্যে ইংরেজ, পর্তুগীজ ও ভারতীয় বণিকদের কথা না বললেই নয়।
শায়েস্তা খানের সুবেদাবির আমলে একজন ইউরোপীয় পর্যটকের লেখায় বাংলার উজ্জ্বল চিত্র ফুটে উঠেছে। ১৬৬৬ খ্রীস্টাব্দে বাংলা পর্যটনকালে ফ্রান্সিস বানিয়ার লিখেন, ‘ বাংলায় চালের সাথে ঘি আর চার-পাঁচ রকমের মটরশুঁটি দিযে এখানে খাদ্য তৈরি হয়। বলতে গেলে বিনা পয়সায় এ রকম খাবার পাবেন। এক টাকায বিশটি বা তার চেয়েও বেশী মোরগ পাবেন। একই দামে সমান সংখ্যক হাঁসও পাওয়া যাবে। প্রচুর পরিমাণে টাটকা ও পোনা মাছও এখানে পাওয়া যায় । এক কথায় বাংলা প্রাচুর্যের দেশ’। তিনি বাংলার সৌন্দর্য ও উর্বরতার প্রচুর প্রশংসা করেছেন। তবে এদেশের আবহাওয়া তার খুব একটা ভালো লাগেনি। তিনি বলেন, ‘এখানকার, বিশেষ করে সমুদ্রের নিকটবর্তী অঞ্চলের আবহাওয়া বিদেশীদের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়।

আরও পড়ুন:  প্রিন্সেস ডায়ানা: একজন রাজকুমারীর গল্প।

শায়েস্তা খান: টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত যার সময়ে।
সাতগম্বুজ মসজিদ

শায়েস্তা খানের স্থাপত্য শিল্প

স্থাপত্য শিল্পের দিক দিয়েও শায়েস্তা খান ছিলেন অনন্য। তার সময়ে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে প্রচুর পরিমাণে অট্টালিকা নির্মিত হয়।
১. ছোট কাটরা (১৬৬৪ সাল): পথিক বণিক এবং দর্শনার্থীদের জন্য নির্মিত হয় ছোট কাটরা। এর ভেতরে রয়েছে এক গম্বুজ বিশিষ্ট একটি ছোট মসজিদ। ছোট কাটরা এবং মসজিদের ধ্বংসাবশেষ এখনো রয়ে গিয়েছে। এখানেই এক প্রাঙ্গনে রয়েছে তার কন্যা চম্পা বিবির সমাধি।
২. মিটফোর্ড হাসপাতালের পাশে অবস্থিত বুড়িগঙ্গার তীরে তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ।
৩. লাল বাগ কেল্লা ও পরি বিবির সমাধি: এটি সম্রাট আওরঙ্গজেবের নামানুসারে আওরঙ্গাবাদ দুর্গ নামেও পরিচিত। শাহজাদা মুহম্মদ আজম এর কাজ শুরু করলেও পরবর্তীতে শায়েস্তা খান এর কাজ অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যান। এখানেই রয়েছে তার কন্যা পরি বিবির বিখ্যাত সমাধি। পরি বিবির আসল নাম ছিল ইরান দুখ্ত। মুহম্মদ আজমের সঙ্গে বাগদান হলেও তার অকালে মৃত্যু হয়। শায়েস্তা খান প্রচুর অর্থ ব্যয় করে কন্যার সমাধি স্থাপন করেন।
৪. সাতগম্বুজ মসজিদ: ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত মসজিদটি ১৬৮০ সালের দিকে নির্মিত হয়। তার শাসনামলে তার পুত্র উমিদ খা মসজিদটি নির্মাণ করেন।
তাছাড়া হোসেনী দালাল, চকবাজার মসজিদ, খিজিরপুর মসজিদ ইত্যাদি তারই কীর্তি।

১৬৮৮ সালের বাংলার সুবেদারির দায়িত্ব ছাড়ার পর তিনি আগ্রায় চলে যান। সেখানেই ১৬৯৪ সালে ৮৬ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।

Leave a Comment