সেন্টিনেলিজ জাতি: নিষিদ্ধ সেন্টিনেল দ্বীপের আদিবাসী।

ভারত মহাসাগরের আকাশী নীল পানিতে অবস্থিত একটি রহস্যময় এবং নির্জনতায় পরিপূর্ণ দ্বীপ হল সেন্টিনেল দ্বীপ। এটি আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত সৌন্দর্যে ঘেরা একটি ছোট দ্বীপ। এই প্রত্যন্ত দ্বীপটি সভ্য সমাজের কাছে “নিষিদ্ধ দ্বীপ” হিসেবেই বেশি পরিচিত, কারণ বহিরাগত মানুষের সেখানে প্রবেশ করা দু:সাধ্য ব্যাপার। চলুন তাহলে রহস্যময় দ্বীপটি সম্পর্কে জেনে আসি।

সেন্টিনেলিজ জাতি: নিষিদ্ধ সেন্টিনেল দ্বীপের আদিবাসী

সেন্টিনেলিজ মানুষরা কেমন?

সেন্টিনেল দ্বীপের আকর্ষণের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে এর আদিবাসী বাসিন্দারা, মানে সেন্টিনেলিজরা। হাজার হাজার বছর ধরে তারা দ্বীপে বসবাস করে বলে বিশ্বাস করা হয়। সেন্টিনেলিজরা নিজে থেকেই বাইরের বিশ্ব থেকে সবসময় নিজেদের বিচ্ছিন্ন রাখতে চায়। বহিরাগতদের সাথে খুবই অল্প যোগাযোগের কারণে তাদের সংস্কৃতি, ভাষা এবং জীবনযাত্রা সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। অনুমান করা হয় তাদের জনসংখ্যা ৫০ থেকে ৪০০ জন, অর্থাৎ তারা বিশ্বের ক্ষুদ্রতম আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির মধ্যে একটি।

সেন্টিনেলিজ জাতি: নিষিদ্ধ সেন্টিনেল দ্বীপের আদিবাসী
Source: eastindiastory.com

সেন্টিনেল দ্বীপ যে কারণে নিষিদ্ধ

সেন্টিনেল দ্বীপ ভারত সরকার কর্তৃক আরোপিত কঠোর বিধি-বিধানের কারণে “নিষিদ্ধ দ্বীপ” নামে পরিচিত। সেন্টিনেলিজদের সুরক্ষা এবং তাদের বিচ্ছিন্ন থাকতে চাওয়াকে সম্মান জানাতে সরকার দ্বীপের চারপাশে ৫ কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। সেখানে বিশেষ অনুমতি নিয়ে তবেই প্রবেশ করতে হয। সেন্টিনেলিজরা বহিরাগতদের তাদের দ্বীপে প্রবেশ না করাকে নিজেদের জন্য মঙ্গলময় মনে করে। সেন্টিনেল দ্বীপের যাওয়া কি জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে তা নিচের কয়েকটি ঘটনা দেখলে পরিষ্কার হবেঃ

আরও পড়ুন:  ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলপথ: পৃথিবীর দীর্ঘতম রেলপথের ইতিহাস।

১৯৭৪ সালে ত্রিলোকনাথ পণ্ডিত নামে একজন ভারতীয় নৃবিজ্ঞানী এবং তার দল সেন্টিনেলিজ উপজাতির সাথে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন। বেশ কয়েকটি জায়গায় ভ্রমণ সহ তাদের সাথে উপহার আদান প্রদানও করেছিলেন। পরবর্তীতে তারা কোনো কারণে তারা সেন্টিনেলিজদের শত্রুতে পরিণত হয়। পরবর্তীতে পন্ডিত তার দলসহ ওই জায়গা ত্যাগ করে।

১৯৮১ সালে প্রিমরোজ নামক জাহাজ সেন্টিনেল দ্বীপের আশেপাশের প্রবালে আটকা পড়ে। পরবর্তীতে জাহাজের ক্রু রা সেন্টিনেলিজদের আক্রমণের শিকার হয়। তারা ক্রমাগত ক্রু দের উপর তীর ছুড়ছিল। পরবর্তীতে সমস্ত ক্রু সদস্যদের হেলিকপ্টার দ্বারা উদ্ধার করা হয়।

সেন্টিনেল দ্বীপের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে ২০১৮ সালে যখন অ্যালেন চাউ নামে একজন আমেরিকান ধর্মপ্রচারক খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারে সেখানে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানে গিয়ে সেন্টিনেলিজ দের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেন্টিনেলিজরা তাকে হত্যা করে। এই ঘটনার কারণে দ্বীপটি নতুন করে আবার আলোচনায় আসে। পাশাপাশি সেখানকার নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করা হয়।

সেন্টিনেলিজ জাতি: নিষিদ্ধ সেন্টিনেল দ্বীপের আদিবাসী
আমেরিকান ধর্মযাজক

সেন্টিনেলিজদের ঐতিহ্য ও দ্বীপের জীববৈচিত্র্য

সেন্টিনেলিজরা তাদের ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব রক্ষায় সর্বদাই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আধুনিক বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে তাদের ঐতিহ্য, আচার-অনুষ্ঠান এবং জীবনধারা সবকিছুই অন্যদের চাইতে আলাদা। সেকারণে তাদের ভাষা অনেকাংশেই অজানা এবং ভিন্ন। সেন্টিনেলিজরা তাদের দ্বীপকে সবসময় কঠোরভাবে রক্ষা করে আসছে এবং বহিরাগতের যোগাযোগের চেষ্টাকে প্রতিহত করেছে এবং তাদের স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন:  অ্যান্টার্কটিকা: পৃথিবীর শীতলতম মহাদেশ। Antarctica

দ্বীপের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে সীমিত তথ্য পাওয়া গেলেও সেন্টিনেল দ্বীপকে উদ্ভিদ ও প্রাণীর অভয়ারণ্য বলে মনে করা হয়। দ্বীপটি ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ এবং ধারণা করা হয় কিছু উদ্ভিদ ও বন্য প্রাণী শুধু ঐ অঞ্চলেই পাওয়া যায়। যাইহোক, সমুদ্রের নীল প্রবাল প্রাচীরে ঘেরা দ্বীপটি সম্পর্কে জানতে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন। ভারত সরকার, সংরক্ষণ সংস্থা এবং নৃতাত্ত্বিকদের সহযোগিতায় সেন্টিনেলিজদের জীবনযাত্রা যাতে বিঘ্নিত না হয় তা নিশ্চিত করে দ্বীপটিতে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে।

Leave a Comment