ডিপ্রেশন নিয়ে কিছু কথা। হতাশা থেকে মুক্তির উপায়।

ডিপ্রেশন বা হতাশা মানুষের জীবনের একটি খুবই সাধারণ কিন্তু দুঃখজনক ঘটনা।এটা মানুষকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের অনেক মানুষ বিভিন্ন কারণে হতাশায় ভুগেন, যার ফলে পারিবারিক কলহ, কাজ করার মানসিকতা কমে যাওয়া ইত্যাদি ঘটনা দেখা যায়। তাছাড়া ডিপ্রেশন সংক্রামক, একজন ব্যক্তি তার পাশে থাকা অন্য একজন ব্যাক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে কাছের মানুষগুলোর মধ্যেও হতাশা, দুঃখ-দুর্দশা দেখা দিতে পারে।

ডিপ্রেশন নিয়ে কিছু কথা

ডিপ্রেশন এমন এক জিনিস যার জন্য মানুষকে অনেক সময় মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পর্যন্ত দারস্থ হতে হয়। তখন ডাক্তার হতাশাগ্রস্ত রোগীর সাথে কাউন্সেলিং এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান দিয়ে থাকেন। যদিও এর বিভিন্ন রকমের চিকিৎসা রয়েছে, তবে একজন ব্যক্তি চাইলে বিষণ্নতার সমাধান নিজেই করতে পারেন। 

আপনি যদি বিষন্নতায় ভুগেন এবং তা কাটিয়ে উঠতে চান তাহলে নিচের কয়েকাটি উপায় নিজের জীবনে প্রয়োগ করে দেখুন, আশা করি হতাশা অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পারবেনঃ

১. আপনজনদের সাথে কথা বলুন

আপনি যখন কোনো সমস্যার সম্মুখীন হবেন বা কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগবেন তখন আপনার একাকীত্ব আপনার সমস্যাকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলবে। তখন আপনার কাছের মানুষদের সাথে কথা বলা আপনার সমস্যাকে অনেকাংশেই কমিয়ে দিতে পারে।

আপনি যখন কারো সাথে আপনার সমস্যার বিষয়ে কথা বলবেন তখন আপনি মানসিকভাবে অনেক হালকা অনুভব করবেন। পাশাপাশি আপনার আপনজনদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারেন, কারণ এই অবস্থায় তারাই আপনাকে সবচেয়ে ভালো বুঝবে। এছাড়াও অন্যদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে আপনার মনকে বিষন্নতা থেকে অন্যদিকে সরিয়ে নিতে পারেন।

২. ব্যায়ামে মনোযোগী হোন

ডিপ্রেশন সম্পর্কে অনেক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে যে ব্যায়াম হালকা থেকে মাঝারি বিষণ্নতা দূর করার জন্য ওষুধের মত কার্যকর। হার্টের রোগ কমানো, ওজন হ্রাস এবং অনেক দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমানোর বাইরেও ব্যায়ামের ডিপ্রেশন কমানোর মত একাধিক মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা রয়েছে।

হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় ব্যায়াম করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে, তাই ছোট কিছু দিয়ে শুরু করা এবং আনন্দদায়ক কিছু করা ভাল। প্রতিদিন একটু হাঁটাহাঁটি করা, ঘরে বসে কিছুক্ষণ মেডিটেশন করা বা গান শুনতে শুনতে ব্যায়াম করা, সবই বিষণ্নতা কমানোর জন্য কার্যকরী। ব্যায়াম ডিপ্রেশন কমাতে সাহায্য করে কারণ এর ফলে মস্তিষ্কে থেকে এন্ডোরফিন নামক রাসায়নিক পদার্থ ক্ষরিত হয়, যা মনকে স্থির ও ভালো রাখতে সাহায্য করে। এমনকি দিনে কয়েক মিনিটের হালকা ব্যায়ামও এন্ডোরফিনের মাত্রা বাড়িয়ে মেজাজ ঠিক রাখতে পারে।

আরও পড়ুন:  সকালের নাস্তায় কি খাওয়া উচিত? সকালের নাস্তার উপকারিতা।

৩. মন থেকে নেতিবাচক চিন্তা দূর করুন

যখন কেউ হতাশাগ্রস্ত হয়, তখন সে প্রায়ই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নেতিবাচক চিন্তা করে। একজন হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি বিভিন্ন ধরনের চিন্তা করতে পারে যেমন- “আমি একজন ব্যর্থ,” “কেউ আমাকে পছন্দ করে না” বা “আমি কোনো কাজের না” ইত্যাদি। অবচেতন মনে এইসব নেতিবাচক  চিন্তা করা এক ধরনের অভ্যাসে পরিণত হয়, যা বিষণ্নতা আরও বাড়িয়ে তোলে।

এই সমস্যার সহজ সমাধান হল নেতিবাচক চিন্তাগুলোকে মন থেকে দূর করে পরিবর্তে ইতিবাচক চিন্তা করা। উদাহরণস্বরূপ, এইরকম চিন্তা করা “এই কাজটি আমার দ্বারা হবে না।” এর পরিবর্তে, “চেষ্টা করলে কেন হবে না?” অথবা আপনার জীবনের কিছু সুখের বা সফলতার স্মৃতি মনে করতে পারেন যা আপনাকে আপনার খারাপ সময়ে সাহস জোগাবে।

৪. নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খান

ডিপ্রেশন বা হতাশায় থাকা একজন ব্যাক্তি সারাদিন কি খাচ্ছে বা কি করছে এ বিষয়ে খেয়াল থাকে না। যা স্বাস্থ্যকে খারাপের দিকে ধাবিত করে। বিভিন্ন জাঙ্ক ফুড সাময়িকভাবে খুধা নিবারনে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু আসলে এই খাবারগুলি রক্তে শর্করার বৃদ্ধি, ওজন বৃদ্ধি এবং মেজাজ খারাপ হওয়ার জন্যও দায়ী।

সমাধান হল আপনার পছন্দের স্বাস্থ্যকর খাবারগুলো খুঁজে বের করুন এবং প্রতিদিন এই খাবারগুলি খাওয়ার অভ্যাস করুন। তাজা ফল, শাকসবজি, সালাদ, চর্বিহীন মাংস, মাছ ইত্যাদি সবই আপনার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আপনি যে স্বাস্থ্যকর খাবারগুলো পছন্দ করেন তা খুঁজে বের করা এবং ক্ষুধার্ত বা মন খারাপ হলে সেগুলি খাওয়ার মাধ্যমে নিজের মনকে অন্যদিকে ডাইভার্ট করা।

৫. পর্যাপ্ত ঘুমান

হতাশা এবং উদ্বেগ উভয়ই অনিদ্রার একটি বড় কারণ হতে পারে, যা আমাদের স্বাভাবিক জীবন-যাপনকে ব্যাহত করে।

এ থেকে পরিত্রাণ পেতে আপনি প্রয়োজনে আপনার রুটিন পরিবর্তন করুন, যা আপনাকে পর্যাপ্ত ঘুমাতে সাহায্য করবে। যেমন:

  • প্রতিদিন একই সময়ে বিছানায় যান।
  • শোবার ঘরে টিভি দেখবেন না কিংবা কম্পিউটার বা মোবাইল ব্যবহার করবেন না।
  • ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে কোনো কিছু খাবেন না।
  • ঘুমানোর সময় রুম অন্ধকার রাখতে পারেন এবং রুম যাতে শান্ত হয় তা নিশ্চিত করুন।
  • ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা আগে সব ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় (যেমন- কফি) এড়িয়ে চলুন।
আরও পড়ুন:  ডায়রিয়া হলে করণীয় কি? লক্ষণ ও প্রতিকার। Diarrhorea

ঘুম আমাদের মস্তিষ্ক এবং শরীরের কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য অত্যাবশ্যক। প্রতি রাতে একটি ভাল ঘুম স্বাস্থ্য এবং মন উভয়কেই ভালো করতে পারে, যা বিষণ্নতার লক্ষণগুলি কমাতে সাহায্য করে।

৬. প্রচুর পানি পান করুন

সকল শরীরবৃত্তিয় কাজের জন্য পানি অপরিহার্য। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা শরীরকে টক্সিন অপসারণে সহায়তা করে, অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলির কার্যকারিতা বাড়ায় যা সামগ্রিকভাবে আপনার শরীরকে ভালো রাখতে সাহায্য করে।

অনেকেই পানির পরিবর্তে বিভিন্ন কোমল পানীয়, ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এবং অ্যালকোহল পান করেন। এই ধরনের পানীয় শরীরে পানির পরিমাণ হ্রাস করে, যার ফলে ডিহাইড্রেশন হয়। পাশাপাশি এগুলো স্থুলতার জন্যও দায়ী।

যদি আপনি পানি খেতে একটু কম পছন্দ করেন, তাহলে নিম্নোক্ত পদ্ধতিগুলো বেছে নিতে পারেন:

  • গরমের সময় ঠান্ডা পানি
  • লেবুর সরবত
  • গরম ভেষজ চা যেমন পুদিনা, আদা
  • ফলের রস, ডাবের পানি ইত্যাদি

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দিনে প্রায় দুই থেকে তিন লিটার পানি পান করা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত পানি আপনার শরীরকে সুস্থ রেখে বিষন্নতা দূর করতে সাহায্য করবে।

৭. দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন আনুন

একজন হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি সাধারণত একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে এবং একই ধরনের একঘেয়েমি কাজ করে থাকে। যা বিষণ্নতা আরও বাড়িয়ে তোলে। উদাহরণস্বরুপ, ঘুম থেকে উঠে কাজে যাওয়া, কাজ শেষে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরা, প্রতি রাতে টিভিতে একই অনুষ্ঠান দেখা, তারপরে বিভিন্ন চিন্তা এবং অনিদ্রার কারণে ঠিকঠাক মত ঘুম না হওয়া। এই জাতীয় প্রতিদিনের একই রুটিন মানুষকে আরও বেশি হতাশার দিকে ধাবিত করতে পারে।

আপনার রুটিনে আহামরি কোনো পরিবর্তন আনার দরকার নেই। যেমন, কাজ থেকে ফিরে বন্ধুদের সাথে একটু আড্ডা দেওয়া, সঙ্গী বা সঙ্গীনির সাথে বাইরে কোথাও খেতে বা ঘুরতে যাওয়া, বাড়ি ফিরে নতুন কোনো মুভি বা  টিভি সিরিয়াল দেখা, বাড়িতে কোনো ছোটখাট কোনো প্রোগ্রামের আয়োজন করা ইত্যাদি।

রুটিন পরিবর্তন করা মস্তিষ্ককে ডোপামিন নিঃসরণে সাহায্য করতে পারে, যা সুখের অনুভূতির সাথে সম্পর্কিত একটি হরমোন। জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে নিয়মিত রুটিনে একটু আধটু পরিবর্তন আনলে কোনো ক্ষতি নেই।

আরও পড়ুন:  ক্যান্সার কীভাবে হয়? ক্যান্সার থেকে মুক্তির উপায়।

৮. নতুন কোথাও ঘুরতে যান

ডিপ্রেশন থেকে বাঁচার টোটকা হিসেবে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার বিকল্প আর কোনো কিছু নেই। আপনি একদিনের জন্য কিংবা দূরে কোথাও কয়েকদিনের জন্য ঘুরতে যেতে পারেন। এটা আপনার দৈনন্দিন একঘেয়েমি কাজ থেকে আপনাকে কিছু সময়ের জন্য হলেও দূরে রাখবে।

দৃষ্টিনন্দন কোনো জায়গার নৈসর্গিক সৌন্দর্য, যেমন পাহাড়, সাগর ইত্যাদি আপনার মনের বিষন্নতাকে নিমিষেই দূর করে দিবে এবং জীবনে মনে রাখার মত কিছু স্মৃতি তৈরি করে দিবে। এটা আপনার দৈনন্দিন জীবনে পুনরায় মনযোগী হওয়ার জন্য একটি টোনিক হিসেবে কাজ করবে।

৯. নিয়মিত হাসার অভ্যাস করুন

হাসি মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণের আরেকটি উপায়। কমেডি শো বা সিনেমা দেখা, কৌতুক পড়া, অন্যদের সাথে হাসি বা বিভিন্ন মজার বিষয় নিয়ে চিন্তা করা যা হাসির উদ্রেক ঘটায়, এ সবগুলোই ডোপামিনের মাত্রা বাড়াতে পারে এবং সাময়িক ডিপ্রেশন দূর করতে সাহায্য করতে পারে।

ডিপ্রেশন নিয়ে কিছু কথা

১০. অন্য কাউকে সাহায্য করুন

আমরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে অনেক সময়ই আত্মমগ্ন হয়ে উঠি। ফলে আমাদের সমস্যাগুলি আমাদের মনে বড় আকার ধারণ করে এবং তা খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারি। এ থেকে মুক্তির একটি সহজ সমাধান হল অন্য ব্যক্তির জন্য কিছু করা বা পোষা প্রাণীর যত্ন নেওয়া।

কোনো দাতব্য সংস্থায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা, কোনো কাজে প্রতিবেশীকে সাহায্য করা বা একটি পোষা প্রাণী পালন করা এর কয়েকটি উদাহরণ। যখন আমরা অন্যদের সাহায্য করি, তখন তা আমাদের আত্মসম্মান বৃদ্ধি করে এবং আমাদের মনকে সমস্যাগুলি থেকে অন্যদিকে সরিয়ে দেয়। হতাশাগ্রস্ত অনুভূতির বাইরে যে কোনও প্রকার ইতিবাচক চিন্তাভাবনা মনকে ভালো করতে সহায়তা করতে পারে।

কিছু কথা

এই কাজগুলি করা একজন হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে প্রথমে চ্যালেঞ্জিং মনে হতে পারে। যাইহোক, প্রতিদিন জীবনের একটি একটি করে পরিবর্তন আস্তে আস্তে জীবনের ধরনকে অনেকটাই পাল্টে দিতে পারে। যা ডিপ্রেশন বা হতাশা থেকে মুক্ত করতে অনেকটাই কাজে দিবে বলে আশা করা যায়। পাশাপাশি কোন পরিস্থিতিতে কি করা উচিত এ বিষয়েও ধারণা বাড়বে। দৈনন্দিন এসব ছোট ছোট পদক্ষেপগুলি ছোট থেকে মাঝারি মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাগুলো অচিরেই দূর করতে পারবে এবং আপনাকে একটি সুখি ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনে সাহায্য করবে।

Leave a Comment