তাজমহল: সম্রাট শাহজাহানের প্রেমের নিদর্শন

ভারতের আগ্রায় যমুনা নদীর তীরে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা বিখ্যাত তাজমহল আধুনিক বিশ্বের সাতটি আশ্চর্যের একটি। মুঘল সম্রাট শাহজাহান এবং তার প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজের স্মরণে তৈরি করেছিলেন এই তাজমহল। এর নির্মানের পটভূমির কারণে সবাই তাজমহলকে ভালবাসার নিদর্শন মনে করে থাকে। মুঘল আমলে নির্মিত এই স্থাপত্যের অনিন্দ্য সুন্দর ও সূক্ষ্ম কারুকার্যের কারনে এখনো এটি বিশ্বব্যাপী সমানভাবে সমাদৃত। তাহলে চলুন তাজমহলের ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে আসা যাক।

তাজমহল: সম্রাট শাহজাহানের প্রেমের নিদর্শন

তাজমহল তৈরির ইতিহাস

তাজমহল তৈরির ইতিহাস জানতে হলে সপ্তদশ শতাব্দীতে ফিরে যেতে হবে। মুঘল রাজবংশের পঞ্চম শাসক হিসেবে ১৬২৮ সালে সম্রাট শাহজাহান ক্ষমতায় আসেন। তার স্ত্রীর নাম ছিল মমতাজ মহল। মমতাজ মহল তার সৌন্দর্য, করুণা এবং বুদ্ধিমত্তার জন্য শাহজাহানের হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছিলেন। দুঃখজনকভাবে ১৬৩১ সালে তাদের ১৪ তম সন্তানের জন্ম দেওয়ার সময় তিনি মারা যান। তার মৃত্যুতে বিধ্বস্ত শাহজাহান মমতাজের সমাধিতে একটি অতুলনীয় সুন্দর স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করার প্রতিজ্ঞা করেন। অবশ্য শাহজাহানের মৃত্যুর পর তাকেও তাজমহলে মমতাজের সমাধির পাশেই সমাধিস্থ করা হয়। তাছাড়া শাহজাহানের অন্যান্য স্ত্রী, মমতাজের প্রিয় পরিচারিকা সহ আরও বেশ কিছু সমাধি তাজমহলের ভেতরে রয়েছে।

তাজমহল: সম্রাট শাহজাহানের প্রেমের নিদর্শন

ভারতবর্ষ ও বহির্বিশ্বের স্থপতি, প্রকৌশলী এবং কারিগরদের একটি দলের তত্ত্বাবধানে ১৬৩২ সালে তাজমহলের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তাজমহলকে আকর্ষণীয় করার জন্য শাহজাহান খরচের কোনো কমতি রাখেন নি। যমুনা নদীর তীরে যে জায়গাটিতে তাজমহল তৈরি করা হয় সে জায়গাটির প্রকৃত মালিক ছিল মহারাজা জয় সিং। শাহজাহান রাজার কাছ থেকে জায়গাটি চেয়ে নেন ও বিনিময়ে তাঁকে আগ্রা শহরের মাঝখানে একটি বিশাল প্রাসাদ তৈরি করে দেন। প্রায় ৩ একর জায়গা জুড়ে মাটি ভরাট করে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। তাজমহল নির্মাণে প্রায় ২২ বছর সময় লেগেছিল এবং এটি ১৬৫৩ সালে সম্পূর্ণ হয়। ধারণা করা হয় যে, ২০,০০০ শ্রমিক এই সৌধ নির্মাণে কাজ করেছিলেন। তাজমহলের নকশা কে করেছিলেন তা স্পষ্টভাবে জানা যায় না। তবে, ধারণা করা হয় যে উস্তাদ আহমেদ লাহোরি প্রধান স্থপতি ছিলেন। আবার অনেকের মতে উস্তাদ ঈসা ছিলেন তাজমহলের মূল ভাস্কর। এছাড়া চিরাগ-উদ-দিন ছিলেন প্রধান কাঠের কারিগর। কথিত আছে, শাহজাহান কারিগরদের হাত কেটে দিয়েছিলেন যাতে তারা আর এরকম সৌধ তৈরি করতে না পারে, যদিও এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় নি। ধারণা করা হয় যে, তাজমহল নির্মাণে ৩২ কোটি রুপি (বর্তমান মূল্য অনুসারে) খরচ হয়েছিল।

আরও পড়ুন:  চীনের মহাপ্রাচীর তৈরির ইতিহাস। The Great Wall of China

তাজমহল নির্মাণে ব্যবহৃত সামগ্রী

তাজমহলের মূল আকর্ষণ হল সাদা মার্বেল পাথর, যা মূলত মাকরানার কেয়ারি (রাজস্থান) থেকে আনা হয়েছিল। তাছাড়া জয়পুর, মধ্যপ্রদেশ এবং চীন থেকে আনা হয়েছিল অন্যান্য মার্বেল পাথর। মার্বেল পাথরের পাশাপাশি তাজমহলে লাল, নীল, হলুদ এবং সবুজ রত্ন ব্যবহার করা হয়েছিল। এছাড়াও সোনা, রুপা, পিতল এবং কাঠের ব্যবহারও ছিল প্রয়োজনমত।

তাজমহলের স্থাপত্যকার্য

মূল সমাধিতে মোট চারটি প্রধান মিনার রয়েছে যেগুলোর উচ্চতা ৪২.৫ মিটার। মূলত ফার্সি স্থাপত্যের অনুকরণে মিনারগুলোর নকশা করার হয়। মাঝে যে পেঁয়াজ আকৃতির গম্বুজ রয়েছে তার উচ্চতা ৭৩ মিটার।
তাজমহলের পশ্চিম দিকে রয়েছে একটি মসজিদ যেটি তিন গম্বুজ এবং তিনটি মিনার নিয়ে গঠিত। তাছাড়া তাজমহলের পূর্ব দিকে রয়েছে একটি জাওয়াব যা দেখতে অনেকটা মসজিদের মতই তবে এতে মিনার নেই। তাজমহলের সামনে রয়েছে ফুল গাছের বাগান ও ঝর্ণা।

দিনে ও রাতে সৌন্দর্যের ভিন্নতার জন্যই মূলত তাজমহল সারা বিশ্বে এতটা সমাদৃত। সূর্যের আলোতে সাদা মার্বেল পাথর বিভিন্ন রঙে ঝলমল করে করে। অপরদিকে চাঁদের আলোতে সাদা মুক্তার মতো দেখায়। যমুনা নদীর জলে তাজমহলের প্রতিফলন দেখতে অসাধারণ লাগে।

তাজমহল সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য

১. তাজমহলের মিনারগুলোর উচ্চতা দেখতে সমান মনে হলেও আসলে সেগুলো সমান নয়। মসজিদের দিকের মিনার দুটি বাকিগুলোর ছেয়ে একটু বেশি উঁচু। হয়ত কোনো কারণ বশতই এরকম করা হয়েছে।
২. তাজমহলের সৌন্দর্য রক্ষা করতে নিয়মিত বিশেষ ধরণের মাটির ও চুনের মিশ্রণ ব্যবহার করে পরিষ্কার করা হয়। তারপর তা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয়, যা মার্বেলের দাগ দূর করে উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে।
৩. দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হতো যে তাজমহলের নকশা যাতে নকল করা না যায় সেজন্য এর কারিগরদের হাত কেটে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু এই ধারণার কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। বরং, মুঘল আমলে কারিগরদের দক্ষতা ও জ্ঞানকে সম্মান করা হতো।
৪. ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে তাজমহল একাধিকবার বিক্রির চেষ্টা করা হয়েছিল। ১৮৩০ সালে ঔপনিবেশিক কর্মকর্তা উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক তাজমহলকে নিজের সম্পত্তি হিসেবে বিক্রির প্রস্তাব দেন। আবার ১৮৬০ সালে, লর্ড কার্জন তাজমহলকে “ভারতীয় জাদুঘর” হিসেবে রূপান্তর করার পরিকল্পনা করেন। সৌভাগ্যবশত কোনো প্রস্তাবই বাস্তবায়িত হয়নি।
৫. জনশ্রুতি রয়েছে যে সম্রাট শাহজাহান কৃষ্ণ বর্ণের মার্বেল পাথর ব্যবহার করে তাজমহলের মতই আরেকটি তাজমহল নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার ছেলেদের সাথে বিরোধের কারণে তিনি তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। এই কৃষ্ণ তাজমহলের ধ্বংসাবশেষ আজও আগ্রার কোথাও লুকিয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
৬. তাজমহলের পুরো নকশা রহস্যে ঘেরা। অনেকে মনে করেন যে, নকশাটি সুফি রহস্যবাদের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। তাজমহলের বিভিন্ন উপাদান যেমন গম্বুজ, মিনার ইত্যাদি সুফি ধারণার সাথে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হয়।
৭. মনে করা হয় তাজমহলের ভিতরে কিছু লুকানো কক্ষ রয়েছে। এই কক্ষগুলো ধ্যানের জন্য এবং সম্রাটের ধন-সম্পদ রাখার স্থান সহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে তৈরি করা বলে ধারণা করা হয়।
৮. তাজমহল এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে করে বিরূপ আবহাওয়া, তাপমাত্রা ও আদ্রতায় টিকে থাকতে পারে।

আরও পড়ুন:  রোমান সাম্রাজ্যের উত্থান পতন। Roman Empire

তাজমহলে ভ্রমণ

তাজমহল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র গুলোর মধ্যে একটি। প্রতি বছর প্রায় ৭০ লক্ষ পর্যটক তাজমহল পরিদর্শন করতে যায়। তাজমহল মূলত সারাবছরই খোলা থাকে। তবে, শীতকাল (অক্টোবর থেকে মার্চ) ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে ভালো সময়। গ্রীষ্মকালে (এপ্রিল থেকে জুন) আবহাওয়া বেশ গরম থাকে।
বর্ষাকালে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। যেহেতু তাজমহল ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রা শহরে অবস্থিত সুতরাং সেখানে বিমান, ট্রেন এবং সড়ক পথে মাধ্যমে সহজেই যাতায়াত করা যায়। আগ্রার কাছেই খেরিয়া বিমানবন্দর অবস্থিত।
তাজমহলে প্রবেশের জন্য টিকিট প্রয়োজন হয়। টিকিট অনলাইনে বা উপস্থিত থেকে কেনা যায়। ভারতীয় ও বিদেশী পর্যটকদের জন্য টিকিট মূল্য ভিন্ন। সূর্যাস্তের পর তাজমহল দেখার জন্য বিশেষ টিকিটের ব্যবস্থা রয়েছে। মূলত সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সময় তাজমহল সবচেয়ে বেশি সুন্দর দেখায়। তাজমহলের ভেতরে খাবার নেওয়া নিষিদ্ধ। তাছাড়া ছবি তোলার জন্যও কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়।

অন্যান্য আকর্ষণ

তাজমহল ছাড়াও আগ্রাতে আরও অনেক আকর্ষণীয় স্থান রয়েছে, যেমন, আগ্রা ফোর্ট, ফাতেহপুর সিক্রি এবং সিকান্দ্রা এই শহরের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র।

আরও পড়ুন:  ক্যাপাডোসিয়া: তুরস্কে মাটির নিচে শহর রয়েছে যেখানে।

১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো তাজমহলকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে। পাশাপাশি ইউনেস্কো কর্তৃপক্ষ তাজমহলকে “বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্য” এর তালিকায়ও স্থান দেয়। এত অনিন্দ্য সুন্দর স্থাপত্য শৈলীর বাইরেও এই স্থাপনা শাহজাহান ও মমতাজ মহলের প্রেমকে চির অমর করে রেখেছে। অধিকন্তু, এটি মুঘল সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি বিরাট নিদর্শন।
যেহেতু তাজমহল ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র, সেজন্য এর সাথে যুক্ত পর্যটন শিল্প ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং উপমহাদেশের সস্কৃতি পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে যদিও তাজমহলের সাদা মার্বেল পাথর বায়ু ও পরিবেশ দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কিন্তু তারপরেও এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার জন্য ভারত সরকার ধাপে ধাপে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

Leave a Comment